আল্লামা নুরুল হক রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর জীবন ও কর্ম।
জন্ম ও জন্মস্থান :
তেতুলিয়া মেঘনা বিধৌত বর্তমান ভোলা জেলার বোরহান উদ্দিন উপজেলাধীন বড় মানিকায় এই কীর্তিমান আলেমে দ্বীন ১৯৩৬ সালের অক্টোবর মাসে ঈমান উদ্দিন হাওলাদার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন
পিতামাতা ও বংশধারা :
মাওলানা নুরুল হক রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর পিতার নাম ইয়াসিন মুন্সী এবং তার সম্মানিতা মায়ের নাম ওসিমুননেসা। তার পিতামহের নাম ইমান উদ্দিন হাওলাদার ইবনুহু হোরাকাজি।
বাল্য জীবন :
বাল্য জীবন থেকেই তিনি ছিলেন প্রতিভা মুখর,সৎ ও মেধাবী । তাই তিনি পিতা কারী ইয়াসিন মুন্সী তার ছেলেকে ছোটকাল থেকেই একজন বিজ্ঞ আলেম হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতেন এবং সে অনুযায়ী তাকে দেখাশোনা করতেন। শিশু নুরুল হক তার পিতাকে আদর্শ হিসেবে মেনে চলতেন। ছয় মাস বয়সে তার মাতা আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে পরলোক গমন করেন। তার মাতৃ বিভোগান্তে শিশুকাল থেকে তিনি বড় বোন হাফেজা খাতুনের স্নেহ মমতা লালিত পালিত হন।
শিক্ষাজীবন :
শিশু নুরুল হকের চাহনিও হস্তপদ সঞ্চালন ও চিন্তা চেতনায় অনুমিত হয়ে ওঠে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও অসাধারণ প্রতিভার আভাস। যার ফলে তার নানা মৌলবী আব্দুল আজিজ তার লেখাপড়া সহ যাবতীয় খরচের ব্যবস্থা করতেন । তিনি সর্বদা তার মঙ্গল ও সু- শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার ব্যাপারে যত্নশীল ছিলেন।
প্রাথমিক শিক্ষা :
বাল্য জীবনে তার পিতা ইয়াসিন মুন্সী রহমাতুল্লাহি আলাইহি যিনি সে অঞ্চলের কারী হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন তার নিকট তিন থেকে তের বছর বয়স পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন। ইয়াসিন মুন্সী রহমাতুল্লাহি আলাইহি নুরুল হকের মধ্যে অসাধারণ প্রতিভার আলো এবং উজ্জল ভবিষ্যতের আভাস দেখতে পেলেন । তিনি নুরুল হকের মঙ্গল কামনায় নিজের নিকট বেশিদিন ধরে রাখা সমীচীন মনে করলেন না । নিজেই তাকে নিয়ে গেলেন টবগী সিনিয়র মাদ্রাসায় ভর্তি করে জ্ঞান সুধায় মনোনিবেশের জন্য।
দাখিল :
তিনি 1948 সালের টবগী সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা থেকে বঙ্গ আসাম মাদ্রাসা এডুকেশন বোর্ডের অধীনে দাখিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন।
আলিম :
তিনি 1950 সালে বঙ্গ আসাম এডুকেশন মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে আলিম পরীক্ষার অংশগ্রহণ করে সেখানেও তিনি সাফল্যের ধারা অব্যাহত রেখেছেন।
ফাজিল :
তিনি ১৯৫২ সালে বঙ্গ আসাম মাদ্রাসা এডুকেশন বোর্ড এর অধীনে ফাজিল পরীক্ষায় অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র হিসেবে সাফল্যের ধারা পুনরায় অব্যাহত রেখেছেন।
উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্যে সফর :
তিনি 1952 সালে কেন্দ্রীয় ফাজিল পরীক্ষায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখায় এবং মাদ্রাসার শিক্ষকদের অনুপ্রেরণায় বাংলাদেশের তৎকালীন ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা কেন্দ্র ছারছিনা দারস সুন্নাত মাদ্রাসায় পড়ার জন্য তিনি ভোলা থেকে সেখানে উচ্চশিক্ষা নিমিত্তে পারি জমান।
জ্ঞানচর্চায় একনিষ্ঠতা :
তিনি ছিলেন কর্তব্যপরায়ণ মনোযোগী ও অধ্যবসায়ী। বড় প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলে বিভিন্ন অঞ্চলের ছাত্রদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের গৌরব লাভ করার যে মনোনিবেশ তিনি নিজের মধ্যে আবিষ্কার করেছেন তা সত্যি অতুলনীয়। তিনি তার আগের চেয়ে বেশি মনোযোগের সাথে অধ্যবসা শুরু করলেন। এমনকি একটি মুহূর্তও তিনি সময় নষ্ট করতেন না। পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হলো তিনি তার হাদিস বিভাগের সেরা শিক্ষার্থী হিসেবে বিবেচিত হন।
কামিল :
ওস্তাদ ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উৎসাহ আর অনুপ্রেরণায় তিনি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা কেন্দ্র ছারছীনা দারুস সুন্নত মাদ্রাসা থেকে 1954 ইং সালে হাদিস বিভাগ থেকে বাংলা আসাম মাদ্রাসা এডুকেশন বোর্ডের অধীনে তিনি সেরা ফলাফল অর্জন করেন।
কেরাতুল কুরআনের বিশেষ কোর্সে অংশগ্রহণ :
ছোটবেলা থেকেই তার তেলাওয়াতের মুগ্ধ ছিল বিভিন্ন মহল । পৈত্রিক কিরাতুল কুরআনের ভালোবাসায় ছাত্র জীবন থেকে তিনি বিভিন্ন কোর্স অংশগ্রহণ করে তার জ্ঞানের সমৃদ্ধিক কামনা করতেন । এমনকি কিরাত জগতের প্রসিদ্ধ কোর্স মুমিন বাড়ি চাঁদপুরের সেখানেও তিনি বিভিন্ন ধরনের লাহানের প্রশিক্ষণ, কারী ইব্রাহিম সাহেবের নিকট থেকে গ্রহণ করে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন।
কর্মজীবন :
তিনি 1954 সালে কামিল সমাপ্তির পরপরই ওস্তাদ মাওলানা আজিজুল্লাহ সাহেবের নির্দেশে টবগী মাদ্রাসার হেড মাওলানা হিসেবে যোগদান করেন । শৈশবের শিক্ষা লীলাভূমি টবগী আলিয়া মাদ্রাসা থেকে শুরু হয় তার শিক্ষকতার মহান পেশা । তখন তিনি ছোট কিংবা তার সমবয়সী সকলকে আপনি বলে কথা বলতেন। এই ছিল তার অমায়িক ব্যবহারের উজ্জ্বল প্রতিফলন।
তিনি ১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত টবগী সিনিয়র মাদ্রাসায় তালিম দান করেন। পরে ১৯৫৬ সালে শরিফ সাহেব হুজুরের নির্দেশে ছোট মানিকা মাদ্রাসায় হেড মাওলানা পথে শিক্ষকতার জয়েন করেন । 1959 সালে তার বিশেষ উস্তাদ নোয়াখালী নিবাসী মাওলানা আজিজ উল্লাহ সাহেবের কঠোর নির্দেশে পুনরায় তিনি নাসির মাঝি মাদ্রাসার হেড মুহাদ্দিস হিসেবে যোগদান করেন। এখানে তিন বছর অত্যন্ত সুনামের সাথে মুহাদ্দিস এর দায়িত্ব পালন করেছেন । প্রিন্সিপাল হুজুরের নির্দেশে অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে তাফসীরে বায়যাবি ও কাশরাফির ওস্তাদ ছিলেন। যা ছিল তৎকালীন সময়ে ছাত্রদের নিকট সবচাইতে কঠিন তাফসীর । তার কিছু ছাত্র বলেন যে তৎকালের এ সব তাফসীরে পড়ানোর লোক খুবই কম ছিল। সেখানে হুজুর আমাদেরকে যে তাত্ত্বিক আলোচনা উপহার দিতেন তা আজও আমরা স্মরণ করি।
ইমামতির দায়িত্ব পালন :
আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি মাওলানা নুরুল হক সাহেব ছিলেন ছাত্র জীবনের প্রারম্ভিক থেকই সুন্দর তেলাওয়াতের উপহার দাতা । যার ফলে টবগী মাদরাসা জুড়ে ছিল তার একটি বিশেষ পরিচিতি তখনকার সময়ে নাহুমের ক্লাসে থাকতেই তিনি ইমামতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন । মাদ্রাসা সংলগ্ন একটি এলাকার মসজিদে ইমামতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
মাদ্রাসা পুনঃ স্থাপনের নিমিত্তে দায়িত্ব গ্রহণ :
তিনি যখন নাসির মাঝি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন তখন ১৯৫৭ সালে নদী ভাঙ্গনের ঘ্রাসে নিমজ্জিত হলে মাদ্রাসাটি পুনঃ স্থাপনের জন্য বহুল চিন্তায় তিনি পতিত হন। এমনকি কত মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে জমিদানের জন্য চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। এবং তিনি মহান আল্লাহতালার অশেষ রহমতে তার মামার সম্পদকে মাদ্রাসার জন্য মঞ্জুর করাতে সক্ষম হন। তার মামা মরহুম মাওলানা আব্দুল জলিল সাহেবের জমিন দান করেন এবং বোরহান উদ্দিন আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীতে তার মামা মাওলানা আব্দুল জলিল সাহেবকে মাদ্রাসারই বিভিন্ন দায়িত্বে সভাপতী ও সেক্রেটারি করে সম্মানে ভূষিত করা হয়েছিল। তার মৃত্যুর পর তাকে মাদ্রাসা মসজিদের সামনে কবরস্থ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তার মামাকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন, আমীন।
পদবিমুখতা :
বোরহান উদ্দিন আলীয়া মাদ্রাসায় কালক্রমে বিভিন্ন সময়ে তাকে পদোন্নতি তথা প্রমোশনের জন্য তার কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী ও ভক্তবৃন্দ প্রার্থীতার জন্য তাকে অনুরোধ করলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন ।এমনকি অধ্যক্ষ পদে যোগদানের অনুরোধ ও সুযোগ আসলেও তিনি নাকচ করে দেন, কারণ তিনি বলতেন এই গুরুদায়িত্ব পালন করতে গেলে যদি আল্লাহ আমার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন তাহলে আমার জন্য উত্তর দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
কারীয়ুল কোরআন আল্লামা মাদানী সাহেবের সাথে সম্পর্ক :
ভোলার চরফাতা দায়রা বাড়িতে এই ইসলামের মহান প্রচারক আগমন করলে সেখানে মাওলানা নুরুল হক রহমাতুল্লাহ আলাইহি তার সাক্ষাতের জন্য যান তখন আল্লামা হাফেজ কারী আব্দুল গনি মাদানী সাহেব তাকে দেখে কথা বলেন এবং তাকে কাছে ডেকে বক্ষের উপর শাহাদাত আঙ্গুল দিয়ে চাপ দেন এবং বলেন আল্লাহ কে ভয় করো। পরবর্তী তাকে কিরাতুল কুরআনের সনদ দান করেন এবং উৎসাহ দেন যে তোমাদের এদেশে আমি এসেছি কতদিন থাকি তা জানি না তবে তোমাকে একটি কথা বলি তোমার মত শত শত আলেম মুহাদ্দিস রয়েছে কিন্তু কোরআনের খাদেম নেই কোরআন সহি শুদ্ধ করে পড়ানোর লোক নেই।
মাদানী সাহেবের পরামর্শ :
আল্লামা আব্দুল গনি মাদানী সাহেব মাওলানা নুরুল হক রাহমাতুল্লাহ এর একজন পন্ডিত হিসেবে উপাধি দেন। তিনি বলেন তোমার পড়া আমার পড়ার মতো আমার পরা আমার ওস্তাদের পড়ার মতো আমার ওস্তাদের পড়া তার ওস্তাদের পড়ার মতো তার ওস্তাদের নবী মুহাম্মদ সাঃ এর পড়ার মতো সুতরাং তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কেরাতুল কুরআনের খেদমতে চলে আসো। কারী আব্দুল গনি মাদানী সাহেবের সঙ্গ থেকে মাওলানা নুরুল হক রাহমাতুল্লাহ গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। যার ফলশ্রুতিতে আল্লামা আব্দুল গনি মাদানী সাহেব মাত্র দুজনকে তার সনদ প্রদান করেন তন্মধ্যে মাওলানা নুরুল হক রাহমাতুল্লাহ আলাইহি অন্যতম।
শিক্ষক আল্লামা আব্দুল গনি মাদানী সাহেবের পান্ডিত্য ও প্রজ্ঞা :
কারী আল্লামা আব্দুল গনি মাদানী সাহেব ছিলেন একজন প্রখর মেধার অধিকারী। তাকে একবার চরফ্যাশনের একজন মাওলানা সূরা বনী ইসরাইল থেকে একটি আয়াতের কিছু অংশ বলে তার পূর্বের শব্দ কি বলতে বললে কারী হাফেজ আব্দুল গনি মাদানী সাহেব বিনা চিন্তায় বলে ফেললেন । মাওলানা জালাল উদ্দিন সাহেব তিনি বলেন মূলত আমি হুজুরের স্মৃতি পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম । আর তিনিই প্রশ্নটি করে ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন দরাদ স্পষ্টভাষী যখন ইসলাম প্রচার করার জন্য মাঠে ময়দানে আলোচনা করতেন একেবারে পিছনের লোকও স্পষ্ট ভাষায় তার কথা বুঝতেন তখনকার সময় বর্তমানে ইলেকট্রিক যন্ত্রমাইক ছিলনা ।যা ব্যতীত তার কন্ঠের বিশালতা আল্লাহ তাআলা ফুটিয়ে তুলেছিলেন। আমরা এ মহান ওলির জন্য জান্নাতুল ফেরদৌস কামনা করি, আমীন।
ইলমে কেরাত প্রশিক্ষণের সূচনা :
তিনি তার ওস্তাদ আল্লামা কারী আব্দুল গনি মাদানী সাহেবের নির্দেশে ১৯৬৭ ইং সনে বোরহান উদ্দিন আলিয়া মাদ্রাসা মসজিদ থেকে তার এই প্রজেক্ট প্রশিক্ষণ পদ্ধতি চালু করেন। পরবর্তীতে এর ব্যাপকতা দেখে তার মামা আব্দুল জলিল সাহেব মসজিদের পাশে একটি বারান্দা দিয়ে তাকে কেরাতুল কুরআনের খেদমতের ব্যবস্থা করে দেন।
এলাহি ইশারা স্বপ্ন :
তিনি যখন তার ওস্তাদ আল্লামা হাফেজ কারী আব্দুল গনি মাদানী সাহেবের নির্দেশনায় কেরাতুল কুরআনের খেদমতে মনোযোগ প্রদান করেন তখন হঠাৎ একদিন মাওলানা নুরুল হক রাহমাতুল্লাহ আলাইহি স্বপ্নে দেখেন তিনি নিজে এবং আল্লামা আব্দুল গনি মাদানী সাহেব একসাথে ফুটবল খেলছেন ।তখন তিনি এটির ব্যাখ্যা বের করলেন। আমাদের কেরাতুল কুরআনের খেদমত আল্লাহ সন্তুষ্ট। তাই তিনি আগের চেয়ে নতুন উদ্যমে কেরাতুল কুরআনের খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত করেন।
মুহাদ্দিস পদের অব্যাহতি :
তিনি ১৯৭০ সালে যখন এলমে কেরাত ও তাজভীদের প্রশিক্ষণ এর ব্যাপকতা অর্জন করতে সক্ষম হন । তখন তিনি মুহাদ্দিসি পদের বিষয়টি উপলব্ধি করে মুহাদ্দিসের পদটি থেকে অব্যাহতি গ্রহণ করেন। এবং কেরাতুল কুরআনের খেদমতে নিজেকে পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেন। তার একজন ছাত্র মাওলানা জালাল উদ্দিন সাহেব জিজ্ঞেস করলেন হুজুর আপনি কেন মুহাদ্দিসের চাকরি ছেড়ে এই সাধারণ চাকরিতে নিজেকে নিয়োগ করলেন ? তিনি উত্তরে বললেন আমি মানুষের চাকরি ছেড়ে আল্লাহর চাকরি ধরেছি !
ইদারার মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা :
তিনি মুহাদ্দিস পদের অব্যাহতি দানের পরপরই পুণ্য কেরাতুল কুরআনের খেদমতের নিমিত্তে একটি পূর্ণাঙ্গ মাদ্রাসা ক্যাম্পাসের স্বপ্ন দেখেন তাই তিনি খোঁজ নিতে থাকেন কোথায় তার কেরাতুল কুরআনের মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করবেন আল্লাহ তাআলার অশেষ রহমতে তিনি কুতুবা ইউনিয়নের একটি সুন্দরতম রাস্তার পার্শ্ব জমি পান।
ইস্তেকামাত :
হুজুর ছিলেন তার কথাই সর্বদা অটল, অনড়, অবিচল তিনি একবার একমত অন্যবার অপর মত তথা দ্বিমত গ্রহণ করা অপছন্দ করতেন। সর্বদা ছাত্রদেরকে আল্লাহর উপর ভরসা করতে পরামর্শ দিতেন।
প্রশিক্ষণ :
ছাত্রদের প্রশিক্ষণে তিনি কখনো অবহেলা করেননি । সর্বদা কিতাব পাঠদানে তার দৃষ্টিগোচরতা ছাত্রবৃন্দের মাঝে ফুটে উঠেছিল। তিনি নিজে আগে কিতাব দেখে পরে দারস দিতেন । তার একজন ছাত্র এবং সঙ্গী বলেন একদিন হুজুর আমাকে একটি লিস্টের বাকি কাজ সমাপ্ত করতে দিলেন। তখন আমি কাজটি সমাধা করেছি সে বিষয়ে হুজুরকে জানাবার জন্য যখন বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম তখন হুজুর ছাত্রদেরকে বলতে শুনেছি যে , আমি আজ কিতাব দেখতে পারিনি তোমরা আগের ছবকটি পুনরায় পড়ো এবং তার থেকে কোন প্রশ্ন থাকলে বলো এভাবে তিনি ছাত্রদেরকে গুরুত্ব সহকারে পড়াতেন।
অধ্যবসায় :
হযরত মাওলানা নুরুল হক রহমাতুল্লাহ আলাইহি এর নিজ মুখের বক্তব্য শ্রবানান্তে মাওলানা রেজাউল করিম বর্ণনা করেন- শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি এমনভাবে অধ্যবসায় কাজে মনোনিবেশ করেন যে একাধারে বহু রাত এমন হতো যে এশারের নামাজের পর থেকে ফজরের আজাদ পর্যন্ত পড়াশোনায় মগ্ন থাকতেন । তার একান্ত সহধর্মিনীর মতে তিনি কিতাব এমন ভাবে তাহকিক, মাসালা ও গবেষণায় মগ্ন থাকতেন যে অনেক সময় এমন হতো ফজরের সময় আজান হলে বলতেন অল্প একটা মাসালার সমাধানে এত সময় চলে গেল !
স্মৃতিশক্তি :
তিনি প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন তার বহু ছাত্র স্মৃতিশক্তির ভূয়সি প্রশংসা করেছেন তার ছাত্রবৃন্দ তালিম এর মধ্যে কখনো স্মৃতিশক্তি দুর্বলতা অনুভব করেননি । তাই প্রায় সময় এমন হতো যে সিরাজুল হক শরীফ সাহেব হুজুর ( তৎকালীন সময় তার অঞ্চলের শ্রেষ্ঠ মোহাদ্দিস) তিনি বিভিন্ন মাসালা নিয়ে তাহকিক করার জন্য তার সাথে বসে সমন্বয় ও সমাধান করতেন।
কেরাতুল কুরআন শাস্ত্রে তার অবদান :
তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর কেরাতুল কুরআনের শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবক। তুমি কেরাত শাস্ত্রে ব্যাপক প্রসার, প্রচার ও গবেষণার জন্য তার সুযোগ্য মেধাবী ছাত্রদের সমন্বয়ে একটি কারিয়ানী বোর্ড গঠন করেছেন। যার নাম দিয়েছিলেন "মজলিসে সূরা" যার মাধ্যমে তিনি তার প্রতিষ্ঠিত ইদারা ইসলাহে কিরায়াত স্কিন পরিচালনা করত..
কেরাতের যুগ শ্রেষ্ঠ রচনা :
১৯৫৮ ইংরেজি তার গভীর গবেষণার ফসল উর্দু তাহসিনুল কেরাত প্রণয়ন করেছেন। যার মূল ইবারতের সাথে ৪০টি কিতাবের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এর হাসিআয় তথা টিকায় প্রায় 110 টি গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে তথ্যবহুল আলোচনার মাধ্যমে কেরাতুল কোরআনের ও তাজবীদের এ সংকলনটি একটি বাইবেল হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
ইদারা মাদ্রাসা বৃদ্ধির জন্য সংগঠন প্রতিষ্ঠা :
ইলমে কিরাত ও তাজভীদের জ্ঞান যখন সময়ের দাবী হয়ে পড়েছিল এর সম্প্রসারণ কথা যখন ব্যাপকহারে উচ্চারিত হচ্ছিল তখন ইদারা মাদ্রাসার হুজুর একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন যার নাম দেন" মুসলিম সংঘ"। ইদারার সংগঠন ও সংবিধানের ভূমিকায় মুহতারাম মাওলানা নুরুল হক রাহমাতুল্লাহ ইদারা পরিচিতিতে উল্লেখ করেন যে যেমন ভাবে ইহজগতের শান্তির জন্য পৃথিবীর সব রাষ্ট্র জাতিসংঘ গঠন করে তার মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছে তেমনি ভাবে আমরা পর জগতের মুক্তির জন্য মুসলিম সংঘের মাধ্যমে কাজ করে যাব। ইনশাআল্লাহ ।
ইদারার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন :
হুজুর যখন ইদারা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন তারপর কোথায় তিনি ইদারার জন্য ভবন নির্মাণ করবেন? এর প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যাবলী সম্পাদনের জন্য তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েন। তখন আল্লাহ তায়ালার অশেষ রহমতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নের মাধ্যমে দেখতে পান এবং তিনি তাকে কোথায় এর ভবন নির্মাণ করলে সুন্দর হবে ভবন নির্মাণ করা যায় সে বিষয়ে তাকে ইঙ্গিত দিয়ে যান।
ইদারা মাদ্রাসা সম্প্রসারণের নিমিত্তে সংবিধান প্রণয়ন :
হুজুর ইদারা মাদ্রাসা সম্প্রসারণ নিমিত্তে যে সংবিধান প্রণয়ন করেছেন তা হলো। প্রত্যেক ইউনিয়ন তাদের মধ্য থেকে একজন আলেমকে নকিব হিসেবে নির্বাচন করতে হবে এবং একটি মসজিদ নির্ধারণ করতে হবে। যেখানে বসে তারা প্রত্যেক ইউনিয়নের পরামর্শ বৈঠক করতে পারেন। এবং এর পরে এই বৈঠকে প্রতি শুক্রবার তথা জুমাবার সকাল ৮ঃ০০ ঘটিকা হয়তো বসতে পারে এবং এই মসজিদের নামকরণ হবে মাশহাদী মসজিদ এবং নকীব মসজিদ গঠন করে এ তিনটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
১. নকীবদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ আলেমকে থানা রব্বানী নির্বাচন করা।
২. সদর থানার কোন এক মসজিদকে জলছাতুল হুদা হিসেবে নির্বাচন করা।
৩. সপ্তাহে যে কোনদিন জলছাতুল হুদার সকল নকিব একত্রিত হবে।
তারপর জেলা তারপর বিভাগ এবং এভাবে প্রদেশিক, দেশীয় এবং মহাদেশীয় বিভিন্ন পন্থায় এ সকল নির্বাচনের মাধ্যমে এই কোরআন এর খেদমত আঞ্জাম দিয়ে যাবে।
ইদারা এর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মাসিক তারবিয়াত অনুষ্ঠান :
ইদারা মাদ্রাসা বৃহত্তর করার জন্য মূলত মাসিক তারবিয়াত অনুষ্ঠান । তাই কিরায়াত অনুষ্ঠানে প্রাক্তন ছাত্রদেরকে তাদের কেরাতের পরিশুদ্ধতা জন্য মুজাকরার মাধ্যমে শিক্ষাদান অথবা ইদারার আধুনিক বিষয়াদি সম্পর্কে অবগতিসহ বিভিন্ন কার্যসূচী প্রণয়ন হতো। এতে হুজুর তার নিজ বাসা থেকে কারী সাহেবগণের খাবার এর ব্যবস্থা করতেন। ইদারা মাদ্রাসা ক্যাম্পাস হয়ে উঠতো লোকে লোকারণ্য।
ইদারা মুজাব্বিদ মাদ্রাসা প্রণয়ন :
১৯৮৩ সালে তৎকালীন ধর্মমন্ত্রী মান্নান সাহেব যিনি ছিলেন জমিয়াতুল মোদ্দারিসিন এর সভাপতি ও দৈনিক ইনকিলাব এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক । তাকে বহু প্রচেষ্টার পর ভোলায় আমন্ত্রণ জানানো হয়।বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে তিনিই ইদারার মুজাব্বিদকে মঞ্জুরি ঘোষণা দেন ।
মুজাব্বির মাহির এর আওতায় পুনরায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ :
বাংলাদেশ মুজাব্বিদ মাহির প্রতিষ্ঠার পরে ১৯৮৬ তে তিনি এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। তারই সহপাঠী ও হলমেট মাওলানা কারী আব্দুর রাজ্জাক বলেন- আমি পরীক্ষার হলেও হুজুরকে লক্ষ্য করেছি তিনি কম লিখেছেন তেমন অতিরিক্ত কাগজ ব্যবহার করেননি । কিন্তু পরীক্ষার ফলাফল দিলে দেখি তিনি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছেন ছাত্র জীবনে তিনি লেখাপড়ায় কঠোর ছিলেন।
ইদারার সিলেবাস সম্পর্কে জৌনপুরী পীর সাহেব হুজুরের মন্তব্য :
ইলমে কেরাত ও তাজবীদ এর গঠন পাঠদান প্রক্রিয়া প্রশিক্ষণের পরিদর্শন শেষে অলিয়ে কামেল এবং জৌনপুরী পীর সাহেব বলেন - ইলমে কেরাতের উপর এত ব্যাপক সিলেবাস নিয়ে ইলমে তাজবিদের যে থিম মাওলানা কারী নুরুল হক সাহেব আবিষ্কার করেছেন আমি তাকে একটি অনার্স এর শোনমান এর বলে মনে করি। কারণ এতে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্ম সকল রীতিনীতি এবং সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্ম বিষয়সমূহের সহজ পদ্ধতিতে উপস্থাপনের মাধ্যমে ছাত্রদের মাঝে উপস্থাপন করা হয়েছে । আমি তার খেদমত সমূহে মঙ্গল কামনা করি,আমিন।
ইসলামী ন্যূনতম জ্ঞান-প্রদান প্রকল্প প্রণয়ন :
ইসলামের প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন সকলের উপর ফরজ কেননা প্রাথমিক জ্ঞান তথা নামাজ আদায়ের নিয়ম নীতি এবং কিছু সূরা সহি শুদ্ধ করে তেলাওয়াত শিক্ষা একটি ফরজের ও ফরজ কাজ। যা বর্তমানে আমাদের সমাজে কিছু সাধারণ মাওলানা এ সকল কাজ করে থাকেন। কিন্তু এ কাজ ছোট করে দেখবার কোন উপায় নেই । যে কোন ব্যক্তি যদি এই খেদমতে আসেন আল্লাহ তার সকল কিছু চাওয়া পূরণ করে দেবেন। ইনসাআল্লাহ। তিনি মুসলমানদের তথা সাধারণ মুসল্লিদের কথা চিন্তা করে মসজিদে মসজিদে ইমামদের সমন্বয়ে তাদেরকে নামাজের বাস্তব তালিম ও কেরাত সহি শুদ্ধ করাতেন।
নাহু সরফের প্রশিক্ষণ :
পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে তিনি ছাত্র জীবনের শুরু থেকে বিভিন্ন কোর্সে যোগদান করে তার জ্ঞানের পরিপক্কতা অর্জন করেছিলেন। নাহু সরফে ছিল তার অত্যাধিক জ্ঞান । নাহু সরফের উচ্চতর দক্ষতার জন্য ছাত্রদের মাঝে জ্ঞানের সংকীর্ণতা অনুভব করতে পেরে একটি শ্রেণী প্রণয়ন করেছেন । যার নাম তিনি দিয়েছিলেন "নাহু ও সড়ক এর প্রশিক্ষণ" সেখানে তিনি যে নোট করে শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন তা দেখে এক বাক্যে তার জ্ঞানের গভীরতা সহজেই অনুমান করা সম্ভব।
নাহু সরফ প্রশিক্ষণ শেষে দক্ষতা যাচাই করণ প্রক্রিয়া :
ছাত্রবৃন্দের দিকে ছিল তার তীক্ষ্ণ নজর । তারা যাতে নাহু ও সরফ শিক্ষা গ্রহণ করে পরে ভুলে না যান সেজন্য তিনি তৈরি করেছিলেন দক্ষতা যাচাইয়ের পদ্ধতি যা সহজে বুঝা ও স্মৃতিশক্তিতে গেথে আছে কিনা তার মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে পড়ার বিষয়টি আরো শক্ত এবং দৃঢ় করে দেওয়া হতো। তিনি ছিলেন একজন শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। শ্রেষ্ঠ শিক্ষক যেমন তার ছাত্রদের অবস্থা বিবেচনা করে কৌশল প্রয়োগ করে ছাত্রদের মনোযোগ আকর্ষণ এবং ছাত্রের শিক্ষা উন্নতি করেন ঠিক তিনিও তাই করে ছাত্রদেরকে তাদের পড়াশোনায় উন্নত করে দিতেন। আরবি ব্যাকরণের ইসম ও ফেয়েল এর আলামত শিখিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হতেন। তার একজন প্রাক্তন ছাত্র খুব আবেগঘন হয়ে বর্ণনা করেছেন যে আমি ইলমে নাহু এবং সরফের কিছুই জানতাম না। কিন্তু আমি হুজুরের কাছে এ বিষয়ে শিক্ষার জন্য যাতায়াত শুরু করার মাধ্যমে এ বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। তিনি খুব সহজেই আমাকে এই বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের পথ সহজ ও সুগম করে দিয়েছেন।
রমজান মাস ব্যাপী ইদারা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম :
১৯৬৭ ইং হতে হুজুর কেরাতুল কোরআন সহিহ সুন্দর করে প্রশিক্ষণ দানের জন্য রমজান মাস ব্যাপী একটি ইদারা প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করেছিলেন। রমজানের অন্তত ১৫ দিন পূর্বে হুজুর ট্রেনিং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছাত্রদেরকে নিয়ে ইদারা মূল কেন্দ্র একটি সভা আহবান করে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা হতে আগ্রহী রমজানে ট্রেনিং চালু করার দরখাস্তের প্রেক্ষিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছাত্রদেরকে বন্টন করে দিতেন যা বর্তমানে সংক্ষিপ্ত আকারে চালু রয়েছে। আল্লাহ তৌফিক দান করলে আমরা ব্যাপক হারে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করব বলে আশা করি ইনশাআল্লাহ।
ইদারাতুল্লাইল প্রতিষ্ঠা :
রমজান মাস ব্যাপী ইদারা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কারী সাহেবানদের কে রমজানে দাওয়াতে যাওয়ার পূর্বে তিনি মাসব্যাপী ইদারাতুল্লাহিল কার্যক্রম অংশগ্রহণ করত; তাদেরকে বিভিন্ন তাজবীদের কায়দা প্রশিক্ষণে আরো দক্ষ করে তুলতেন । বিভিন্ন গঠনমূলক দিক নির্দেশনা এবং ইদারা কিভাবে আরো কল্যাণময়ী করে এর প্রশিক্ষণকে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা যায় সেই প্রক্রিয়া উপস্থাপনের মাধ্যমে তাদেরকে আরো দক্ষ করে তুলতেন।
ইদারা খেদমতে তার ত্যাগ :
মরহুম মাওলানা নুরুল হক রহমাতুল্লাহ আলাইহি একবার ইদারা মাদ্রাসার খেদমতে ঢাকার এক জায়গায় তিনি সারারাত সোফার উপর শুয়ে কাটিয়ে দিয়েছিলেন প্রায় এমন দিনও চলে যেত তিনি সারাদিন ইদারার কাজে ব্যস্ত থাকায় পানাহার করার সুযোগ হয়নি ! এমনও সময় হতো তিনি রোদে পুড়ে এবং বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে যেতেন এমন অনেক ত্যাগের উদাহরণ তিনি সহসা গ্রহণ করেছিলেন শুধুমাত্র আল কোরআনের খেদমতে।
স্বপ্নের বীজ বপন :
আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি যে আল্লামা নুরুল হক রাহমাতুল্লাহ কোথায় একাডেমিক এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন এর চিন্তায় থাকাকালীন তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন যে রাসূল সাল্লাল্লাহু সালাম তাকে একটি জায়গায় নির্দেশনা দিয়ে বলছেন যে যাতে সেখানে প্রশাসনিক ভবন উত্তোলন করা হয়। সেখানে তিনি স্বপ্নের সেই নির্দেশনা তথা ইঙ্গিতের আলোকে স্থাপনের জন্য মাটির নিচ থেকে ফাউন্ডেশন এর কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন। ১৯৭৬ সালে এ কঠিন কাজ তিনি শুরু করে তারপর পরবর্তীতে কিছুটা কমপ্লিট করে সমাপ্ত রাখেন কিন্তু তারই সুযোগ্য সাহেবজাদা মাওলানা রেজাউল করিম সেখানে দি তলা ভবন স্থাপন করে তার বাবার স্বপ্নকে রূপ দান করেছেন এবং সেখানেই দ্বারা স্কিনের কার্যক্রম চালু রয়েছে।
ইদারা প্রশিক্ষণে বাধা ও তার মোকাবেলা :
আল্লামা নুরুল হক রহমাতুল্লাহি আলাইহি যখন ইদারা প্রশিক্ষণ ব্যাপক হারে মসজিদ ভিত্তিক কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছিলেন তখন তার প্রতিপক্ষ বিরোধী কিছু মহল মাথা উঁচু করে এর বিরোধিতা করতে থাকে। এমনটি ঘটেছিল ভোলার বাংলাবাজার এলাকায়। হুজুর তার একান্ত ছাত্র মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক সাহেবের সাথে বাংলাবাজার এর পূর্ব পাশে একটি মসজিদে ছিলেন। তখন তিনি তার বিরোধীদের উদ্দেশ্যে বললেন তারা বুঝেনা আমরা এখানে সফলভাবে ইদারা প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করবে ইনশাআল্লাহ। পরবর্তীতে লক্ষ্য করা যায় যে হুজুরের বিরোধীগন রমজানের 10 তারিখ অতিক্রম হলে তারা তাদের ভুল বুঝতে পারে এবং তারা হুজুরের নিকট এসে মাফ চান এবং ইদারার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে তারা সনদ গ্রহণ করেন।
পরামর্শ :
হুজুর যে কোনো কাজ করতেন সকল কিছু তার ছোট বড় অথবা ছাত্র সকলের সাথে পরামর্শ করে নিতেন এবং বলতেন পরামর্শের মধ্যে বরকত রয়েছে তিনি এ কথা বলতেন যে কোরআনে বলা হয়েছে "তারা যেন কোন বিষয়ে পরামর্শ করে"।
নতুন প্রচেষ্টার উন্মোচন :
হুজুর অধিকাংশ সময়ে নতুন নতুন কৌশল ও তার চেষ্টার উন্নোচন করে তার ছাত্রদের থেকে অনুভূতি জানতেন । ইদারা যেহেতু ব্যাপক আকারে শুরু করেছিলেন তাই তিনি অনেক নতুন প্রচেষ্টার উন্মোচন করতে হতো । প্রকৃত পক্ষে তিনি ছিলেন একজন সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব। যার ফলে তিনি ছোট বড় প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত প্রায় 40 খানা কিতাব প্রণয়ন করেছেন।
ইদারা প্রশিক্ষণ প্রদর্শনী প্রণয়ন :
তিনি প্রদর্শনীর মাধ্যমে মক্তবের শিশু কিশোরদেরকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদর্শন করতেন। যার ফলে শিশুদের সহজে স্মৃতিতে আবদ্ধ করাতে সক্ষম হতেন । যেমন তিনি নামাজের প্রশিক্ষণ প্রদর্শনীর মাধ্যমে তাদেরকে ফরজ ওয়াজিব সুন্নত ও মুস্তাহাব এবং নামাজের করণীয় বর্জনীয় কাজের হিসাব এর দ্বারা প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদেরকে বাস্তবিকভাবে তাদের স্মৃতিতে আবদ্ধ করিয়ে দিতেন।এমন ভাবে তিনি সালামের প্রদর্শনী, কালেমা তাইয়্যেবার প্রদর্শনী প্রদান করতেন।
রমজানের প্রশিক্ষণ শেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম এর হাদিসের অনুসরণে কারীদেরকে হাদিয়া বন্টন করেন :
ইদারা প্রশিক্ষণের জন্য যে সকল কারীদেরকে তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরণ করতেন তাদের নিকট থেকে যে সকল হাদিয়া আসতো তা তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু সালামের হাদিসের অনুসারে বন্টন করে দিতেন। যে যা হাদিয়া পেতো কেন্দ্রে এনে জমা দিতো।তাদেরকে কেন্দ্র থেকে হাদিয়া দিয়ে দেওয়া হতো।যেমনটি সাহাবাদের মধ্যে বন্টন নীতিতে পরিলক্ষিত করা হয়েছে। যে কোনো সম্পত্তি পাক সে যেন আগে তার রাষ্ট্রীয় ভান্ডারে জমা করেন। তা থেকে তাকে বন্টন করে দেওয়া হবে যে অংশটুকু সে শুধু সে অংশেরই অংশীদার হবেন।
কেরাতুল কুরআনের খেদমত ও তার প্রত্যাশা :
তিনি বোরহান উদ্দিন আলিয়া মাদ্রাসার মুহাদ্দিস পদের মতো সম্মানিত পদটি এবং বেতনভুক্ত চাকরি ছেড়ে দিয়ে যোগ দিয়েছিলেন কেরাতুল কোরআন এর খেদমতে। ইদারা গঠন পাঠদান প্রক্রিয়ায় বিনা বেতনের চাকরিতে। কেন মুহাদ্দিস পদ থেকে অব্যাহতি নিয়ে কেরাতুল কোরআনের খেদমতে চলে এসেছেন ? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন আমি মানুষের চাকরি ছেড়ে আল্লাহর চাকরি ধরেছি আমার মত শত শত মুহাদ্দিস আছে কিন্তু কোরআনের খাদেম নাই। কেরাতুল কোরআন এর খেদমতে কাউকে তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। সহিহ শুদ্ধ করে পড়ানোর লোক নাই।
প্রিয় পাঠক ও বন্ধু মহল কি ছিল তার ধ্যান-ধারণা! একটু কি কল্পনা করা যায় ! অথচ আমরা এখনো অনেক দামী দামী চাকরির প্রত্যাশায় দিন রাতকে বিসর্জন দিচ্ছি অথচ তিনি কি করেছিলেন ? বর্তমানে এ পদটি পাওয়ার জন্য কতজন না পাগল পারা হয়ে রয়েছেন !অথচ তিনি কি আমাদের থেকে অজ্ঞ ছিলেন? তার কি কোন জ্ঞানের ত্রুটি রয়েছে ? তাই আসুন কুরআনের খেদমতে নিজের সামান্য ত্যাগ আল্লাহর সামনে উপস্থাপনের চেষ্টা করি।
হ্যাঁ বন্ধুরা আশ্চর্যের বিষয় কি জানেন ? যদি শুনেন যে আল্লাহ তাআলা এতই চমৎকার একটি উদাহরণ আমাদের জন্য প্রেজেন্ট করেছেন তাহলে খুবই অবাক হবেন । তা হল হাদিসে কুদসীতে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা নিজেই বলেন হযরত আবু সাঈদ রাদিয়াল্লাহ আনহু বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি কোরআন এবং হাদিসকে উপস্থাপন এবং এর আগত সমস্যার সমাধানের প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকে এবং সে মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে এর প্রতিদান প্রত্যাশার সময় পায়না (ব্যস্ত থাকে) তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে তার প্রতিদানের যা প্রত্যাশা করত তার থেকে উত্তম কিছু দ্বারা তাকে আল্লাহ তা'আলা প্রতিদান প্রদান করবেন।
সুবহানাল্লাহ আপনি আমি অন্য কোন ভাল চাকরি করব ঠিকই কিন্তু চাকরি করে আল্লাহর কাছে ভালো কিছু চাইবো তিনি তা দিতে পারেন আবার নাও দিতে পারেন কিন্তু যারা কোরআনের খেদমতে নিজেকে ব্যস্ত রাখে ব্যস্ত থাকে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার সুযোগ হয় না তারপরও আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তাদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি প্রতিদান উত্তম প্রতিদান প্রদান করে তাদেরকে বরকতম এবং কল্যাণময় করে তুলবেন।
ইলমি আলোচনা :
হুজুরের একজন অন্তরঙ্গ ছাত্র মাওলানা আব্দুস শহীদ যিনি বোরহান উদ্দিন আলিয়া মাদ্রাসার স্বনামধন্য একজন প্রাক্তন শিক্ষক ছিলেন তিনি বলেন যে হুজুরের সবচেয়ে যে জিনিসটি আমাকে বেশি আকৃষ্ট করতো তা হলো ইলমি আলোচনা যখনই আসতাম বসতাম তখনই তিনি এলেম এর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণা,চিন্তা, মতামত এর ব্যক্ত করতেন এবং আমাদের সাথে পরামর্শ করে সে জ্ঞানের সমুদ্রে যেন ডুব দিয়ে পড়তেন।
হুজুর রাতকে রাত কাটিয়ে দিতেন তার লেখনীতে এমনকি বোরহান উদ্দিন আলিয়া মাদ্রাসার এক কর্মচারী বলেন আমি ঢাকা যাচ্ছিলাম পথিমধ্যে হুজুরকে লেখাপড়ার কাজে মগ্ন থাকতে দেখেছি তিনি পুরো লঞ্চে বসে বসে সারারাত জেগে লেখালেখির কাজ সম্পন্ন করেছেন। তিনি বিভিন্ন মাসলা মাসায়েল এর উপর অসংখ্য কিতাব লিখেছেন ইসলামী জীবন পরিচালনার গাইড লাইন "ইসলামী জিন্দেগি গঠন" সম্পর্কিত ইসলামী শরীয়তের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো প্রণয়ন করে তিনি তার সদকায়ে যারিয়া অব্যাহত রেখেছেন ।
বিরতিহীন লেখক :
হুজুর একাধারে পাঁচ থেকে সাত আট ঘন্টা একটানা বসে লিখতে পারতেন যা তার খাদেম বিস্ময়কর ব্যাপার হিসেবে বর্ণনা করেছেন । হুজুর তার কলম চালিয়ে যেতেন নির্বিঘ্নে বিরতিহীন লেখায় । কোন ক্লান্তি আমরা হুজুরকে অনুভব করতে দেখিনি এ যেমন এক আজব অনন্য মানুষ।
সফরে জ্ঞান অন্বেষণ :
পড়াশোনায় যেন ছিল হুজুরের আত্মতৃপ্তি । তিনি কোন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লে অধ্যয়ন করতে না পারলে আত্ম হাহাকার চলে আসতো। কখন আবার পড়াশোনায় মনোযোগ দিবেন সে চিন্তায় এমনও ঘটনা বর্ণিত আছে যে তিনি সফরের সময়ে গাড়িতে লঞ্চে এবং বিভিন্ন যানবাহনে বসে বসে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন তো পড়েছেন।
বিভিন্ন বিষয়ে পাণ্ডিত্য :
জ্ঞান সমুদ্রের অনেকগুলো শাখায় বিচরণ রয়েছে হুজুরের । তিনি অনেক কিছুর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। ইলমে কেরাম ,তাজবিদ , ইলমে ফারায়েজ , ইলমে নাহু ওয়াস সরফ , উলুমে তাফসির , উলুমুল হাদিস এর একজন বিজ্ঞ ও সফল শিক্ষক ছিলেন।
তার রচিত গ্রন্থাবলী :
১. কায়দা এ ইদারা।
২. ইছলাহুল কিরায়াত।
৩. ইছলাহুস সালাত।
৪. নাজিরাতুল কিরাত।
৫. আলামতে কেয়ামত।
৬. আফাতুল লি সান।
৭. তাদরিবুস সালাত।
৮. মাসায়েলে হায়জে নেফাস ।
৯. ছিয়ানাতুল কিরায়াত।
১০. রিয়াজাতুল কিরায়াত।
১১. ইসলামী জিন্দেগি গঠন।
১২. বাংলা শরহে জাজরী।
১৩. তাহসিনুল কেরাত।
১৪. ফয়সালা এ জাল্লাতুল কারী।
১৫. স্বপ্নের তাবির।
১৬. ইদারার এলমি আহকাম এর বাস্তব নমুনা।
১৭. ইদারার মুখতাসার দুই খুতবা।
১৮. ইদারা পরিচিতি।
এছাড়াও লেখকের আরো কিছু গ্রন্থ অপ্রকাশিত ইদারার তাসনিফ ফান্ডে সংরক্ষিত আছে ।
ইনশাআল্লাহ এ সকল অপ্রকাশিত কিতাব গুলো অচিরেই প্রকাশ করা হবে ।
প্রবন্ধ সমূহ :
১. নোসখায়ে রুমুজে আওকাফ ।
২. নোসখায়ে হেদায়েত নামায়ে মুদির।
৩. নোসখায়ে তাদরীবুল আইম্মাহ।
৪. নোসখায়ে সায়াদাতুত্তাকওয়া।
৫. মোখতাছার দিয়ানাত।
৬. হাদিয়ায়ে ইদারা।
৭. মিছাকুল আইম্মাহ।
৮. নোসখায়ে নাহু ওয়াস সরফ।
৯. ইসলামী পরিবার।
১০. আলেমদের ঐক্য।
লেখক হিসেবে আল্লামা নুরুল হক (রহ:) :
তিনি লেখক হিসেবে ছিলেন অতুলনীয়। তিনি তার লেখনীতে যে শব্দ লালিত্যময় ও ভাষার মাধুর্যতা প্রকাশ করেছেন তা সংকলক ও একজন লেখক হিসেবে লেখনি শক্তির প্রমাণ বহন রাখে। তার সুযোগ্য সাহেবজাদা মাওলানা রেজাউল করিম সাহেব বলেন তিনি এত সংখ্যক বই রচনা করেছিলেন যে তা যদি আমরা তার জীবনের প্রত্যেক দিন কে নিয়ে গণনা করি তাহলে দেখব যে তিনি প্রতিদিন কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫ পৃষ্ঠার চেয়েও অনেক বেশি লিখেছেন যা ইদারা ফান্ডে প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত অবস্থায় সংরক্ষিত রয়েছে।
হিকমত পূর্ণ জিন্দেগি :
হুজুর অত্যন্ত কৌশল অবলম্বনী ছিলেন। তিনি তার জীবনকে এমনভাবে পরিচালিত করে গড়ে তুলেছিলেন যে তার কথাবার্তা চলাফেরা কাজকর্ম এবং তার চাল চলন সবগুলোই ছিল যেন বিভিন্ন কৌশলে সমাদ্রিত। হুজুরের সঙ্গে যে পাগড়ি থাকতো এবং হাতের যে লাঠিটি থাকতো তিনি কোথাও গেলে এই পাগলি মোবারক এবং তার হাতের লাঠি এমন জায়গায় রাখতেন যাতে তিনি চলে আসার সময় সেগুলো ভুলে না রেখে আসেন। এভাবে তিনি হিকমত পূর্ণ জিন্দেগী পরিচালিত করেছেন।
স্বপ্নের তাবির :
হুজুর ছিলেন একজন বিজ্ঞ স্বপ্নের তাবির বিশারদ । যার ফলে তিনি কোরআন এবং হাদিসের নিরিখে সহজে মানুষদেরকে স্বপ্নের তাবিরের সমাধান করতে সক্ষম হতেন । তার একজন ছাত্র মাওলানা হারুন তিনি বলেন আমি একবার লঞ্চে করে ঢাকা যাচ্ছিলাম । লঞ্চে ঘুমিয়ে পড়লে একটি স্বপ্ন দেখি । পরবর্তীতে আমি ঢাকা থেকে এসে হুজুরকে শুধু স্বপ্নটি বললাম কোথায় দেখেছি কোথায় ছিলাম এগুলো কিছুই বর্ণনা করিনি । আমার স্বপ্ন শোনার পর তিনি বলে উঠলেন তুমি তো স্বপ্ন লঞ্চে দেখেছো। সেখানে কি হয়েছে বল ? তখন আমি প্রশ্ন করলাম হুজুর আপনি কেমনে বুঝলেন আমি এ স্বপ্ন লঞ্চে দেখেছি ? তিনি বললেন তোমার স্বপ্নেই আমাকে বলে দিয়েছে ! হুজুর যে সমাধান দিয়েছেন তাই পেয়েছি।
কোরআন ও হাদিসের নিরিখে স্বপ্নের বিশ্লেষণ :
তিনি কোরআন ও হাদিসের গভীর জ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্য ও পরিবেশ পরিস্থিতি জিজ্ঞাসা করে সমাধা দিতেন একদিন একজন হুজুরের মুহিব্বিন ছাত্র এসে বলল হুজুর আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমি নামাজ পড়তেছি এবং কোরআন তেলাওয়াত করতেছি। তখন হুজুর সেই আয়াতগুলো আমাকে বাংলা অনুবাদ করে স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়ে বলে দিলেন । আল্লামা সিরাজুল হক শরিফ সাহেব হুজুর এর জীবনী প্রণেতা প্রফেসর তাজুল ইসলাম বলেন একদিন স্বপ্ন দেখেছি চামুল (গ্রাম্য একটি গাছের) মাথায় উঠে গোসল করতেছি । এ স্বপ্ন যখন আমি হুজুরের নিকট বর্ণনা করলাম তখন হুজুর আমাকে বললেন সরকারি চাকরিতে বিনা সমস্যায় রিটায়ার্ড করবেন আমি একটু ভয় থাকতাম রিটায়ার্ডের সময় আমার একটি গোপন সমস্যা ছিল যা পরে কেটে গেছে এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়ন হয়েছে।
স্বপ্নের তাবিরের যথাযথ বাস্তবতা :
স্বপ্নের তাবিরের তিনি ছিলেন একজন পন্ডিত ব্যক্তিত্ব । যার কাছে স্বপ্নের কোনো অংশ ভুলে বর্ণনা না করলেও বলে দিতেন তোমার স্বপ্ন আরও বাকি আছে। মনে করে নাও ! ভাবতে অবাক লাগে তাইনা ? এ কথা দিবালোকের ন্যায় সত্য যে তিনি বহু মানুষকে এভাবে সমাধান দিয়েছেন। তার স্বপ্নের যথাযথ সমাধা পেয়েছে এমন অনেক লোক আমাকে বলেছেন । তাদের নাম উল্লেখ করতে চেয়েও পারছি না এখান অনেক বড় লিস্ট হয়ে যাবে তাই প্রকাশ করা থেকে বিরত রইলাম।
ইস্তেখারার যথাযথ সমাধান :
মানুষ কোন কাজ শুরু করার পূর্বে যে আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুগ্রহের জন্য হাদিসে বর্ণিত পদ্ধতির মাধ্যমে যে ইস্তেখারা করেন তার সে সমাধানের জন্য হুজুরের কাছে আসলে তিনি যথাযথ সমাধান করে দিতে পারতেন। কেউ কখনও ইস্তেখারার পর কোন কাজে হাত দিয়ে অমঙ্গল অনুভব করেনি এবং কোন কাজে হুজুর নিষেধ করেছেন তা করেছেন কিন্তু তাতে বাধা প্রাপ্ত হননি এবং অমঙ্গল হয়নি এমনটিও হয়নি। ফলাফল না পাওয়া অভিমত ও খুঁজে পাওয়া যায়নি । সুতরাং বলা যায় তিনি ছিলেন ইস্তেখারার ব্যাখ্যায় খুবই পারদর্শী।
বিংশ শতাব্দীর ইবনে সিরিন উপাধি :
হুজুরের স্বপ্নের তাবীরে আকৃষ্ট হয়ে তার এক ছাত্র এমন মন্তব্য করেন যে হুজুর ছিলেন এ যুগের ইবনে সিরিন কারণ আমি যত স্বপ্ন দেখেছি আমার পরিবার ও যত স্বপ্ন দেখেছে সকল সমস্যার হুজুর যে সমাধান দিয়েছেন তা ই প্রতিফলিত হয়েছে তাই আমি বিংশ শতাব্দীর ইবনে সিরিন হিসেবে হুজুরকে মনে করি।
জ্যোতিঃশাস্ত্রে হুজুরের পাণ্ডিত্য :
হুজুরের একজন ছাত্র মন্তব্য করে বলেন আমি হুজুরের মৃত্যুর দুই বছর পূর্বে হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছি। তখন দেখেছি হুজুর জ্যোতিঃশাস্ত্রের একটি নকশা তৈরি করেছেন। আমাকে বলেছেন আমি একটি নকশায় জ্যোতিঃশাস্ত্র কে অঙ্কন করতে চাচ্ছি হুজুর ছিলেন জ্যোতিঃ শাস্ত্রের একজন বিজ্ঞ আলেম।
নাম সংশোধন ও পরিবর্তন :
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত নাম সংশোধন ও পরিবর্তন করে দেয়া।
হুজুর এ পুণ্যের কাজটিতে ছিলেন খুবই আগ্রহশীল । তিনি যদি কারো নামে কোন ত্রুটি দেখতে পাইতেন সাথে সাথেই তাদেরকে সুন্দর নাম দিয়ে ভূষিত করতেন এবং নাম পরিবর্তনের নির্দেশনা দিতেন। যেমন : একজন ছাত্রের নাম ছিল হারেস কিন্তু হুজুর পরিবর্তন করে তার নামটি দিয়েছিলেন হারেস উদ্দিন।
ফজরের নামাজের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষ সুন্নত আদায় :
রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামাজের পর তার মুসল্লিদের খোঁজ খবর নিতেন এবং জিজ্ঞেস করতেন কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছে কিনা ? কারো কোন সমস্যা আছে কিনা ? ঠিক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ সুন্নত ও হুজুর পালন করতেন ইদারা মাদ্রাসা মসজিদে নামাজের শেষে মুসল্লিদের সাথে কুশল বিনিময় খোঁজখবর ও স্বপ্নের কথা জিজ্ঞেস করতেন।
নামাজের প্রতি হুজুরের গুরুত্ব :
হুজুরের একমাত্র প্রিয় খাদেম মাওলানা হারুন সাহেব বলেন- হুজুর নামাজ আদায়ে এত খুশু ও খুজু সহকারে আদায় করতেন । আমি পিছনে বসে ভাবতাম এত গুরুত্বপূর্ণভাবে আমি কোন আলেমকে নামাজ আদায় করতে দেখিনি। তিনি যেন তার রবের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন একান্ত চিত্তে, দাঁড়াচ্ছেন,কথা বলছেন, কি সম্পর্ক যেন স্থাপন হচ্ছে বসে, সেজদায় এবং রবের সাথে গভীর সম্পর্ক রূপান্তরিত হচ্ছে।
টাকা বনাম শিক্ষা কোনটি ?
হুজুর সর্বদা ছাত্রদেরকে টাকার মুহতাজ হওয়া থেকে বারণ করতেন। কোরআন শিক্ষায় আল্লাহ ইজ্জতের সাথে রিজিকের ব্যবস্থা করবেন তাই তিনি এ কথাটুকু বারবার তার ছাত্রদের সামনে উত্থাপন করে তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতেন। আল্লাহর উপর ভরসা করে ইজ্জতের সাথে রিজিকের ফয়সালা যেন হয় তাই কুরআনের খেদমতে নিয়োজিত থাকতে তিনি সর্বদা ছাত্রদেরকে উৎসাহ দিতেন।
জ্ঞান আহরণে উৎসাহ :
হুজুর সব সময় ছাত্রদেরকে জ্ঞান আহরণের জন্য পরামর্শ ও উৎসাহ দিয়ে যেতেন। জ্ঞানের জন্য তিনি জন্মভূমি ছাড়ার ও নির্দেশ দিতেন। যার ফলে আজ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ মুহাদ্দিস পদ অলংকৃত করে আছেন তার বিজ্ঞ ছাত্রবৃন্দ কারণ তারা তার শিক্ষকের কথা অনুসরণ করে ছাত্র জমানায় শিক্ষার জন্য সফর করেছিলেন।
নীতিতে কঠোরতা :
মাওলানা নূর মোহাম্মদ সাহেব বলেন যে আমরা যখন হুজুরের কাছে পড়তাম তখন হুজুর আমাদেরকে নীতির বাইরে চলা পছন্দই করতেন না । তিনি ছিলেন নীতিতে অত্যন্ত কঠোর।
মাদ্রাসায় যে সকল নীতি ছিল তার চুল পরিমাণও কাউকে অমান্য চলুক পছন্দ তো দূরের কথা এটি ভাবতেও দিতেন না।
অল্প কথায় গভীর প্রকাশ :
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন অল্প কথায় গভীর প্রকাশক । তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলা হয়েছিল "জাওয়ামেউল কালেম"। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই আদর্শ অনুসরণে নিজের জীবন বাস্তবায়ন করতে তিনি সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। তাই ছাত্রদেরকে সহজে অল্প কথার মাধ্যমে গভীর তত্ত্ব প্রকাশ করতে সক্ষম হতেন। যা তার বিভিন্ন মহলের ছাত্রবৃন্দ অনায়াসে উচ্চারণ করেছেন।
অন্যায়ের প্রতি অনড় :
১৯৯০ সালে হুজুর একদিন ঢাকাতে তার ছাত্র হোসাইন শরীফ সাহেবের নিকট আগমন করেন। হোসেন শরীফ তার একটি দাওয়াতে ওস্তাদকে নিয়ে যান। সেটি ছিল একটি বিবাহের অনুষ্ঠান। সেখানে হুজুর পুরুষ মহিলা একসাথে বসে খেতে দেখে সেখান থেকে উঠে চলে আসেন। তিনি তখন আর ভাত খাননি এবং বললেন আমাকে এমন মজলিসে আর কখনো নেবে না।
যে সকল ছাত্রদের নিকট তিনি বেশি যাতায়াত করতেন :
হুজুর ইদারার বিভিন্ন কাজে ঢাকাতে প্রায় সময় আগমন করতেন। তাই তিনি তার প্রিয় ছাত্র মাওলানা শামসুল হক সাহেব, মাওলানা নূর মোহাম্মদ সাহেব, মাওলানা হোসেন শরীফ সাহেব, মাওলানা হাফেজ ফয়জুল্লাহ সাহেব এর নিকট থাকতেন এবং রাতের অধিকাংশ সময়ে কোরআন শিক্ষার জন্য বাংলাদেশের প্রত্যেকটি ঘরে ঘরে শুদ্ধ কোরআন প্রশিক্ষণ ও নারী-পুরুষ সকলে যেন ইসলামের পথে জীবন পরিচালনা করতে পারে সে চিন্তায় ব্যস্ত থাকতেন।
সময়ের মূল্যায়ন :
হুজুর সর্বদা সময়ের মূল্যায়ন করতেন। খাবারের সময় খাবার,গোসলের সময় গোসল,সকল কিছু তিনি যথাসময়ের মধ্যে সম্পাদন করতেন। যখনই সময় পেতেন তাকে অনেক মূল্যবান মনে করতেন। তিনি বলতেন তুমি সময়কে মূল্যায়ন কর, সময় একদিন তোমাকে মূল্যায়ন করবে। আজ সত্যিই সময় তাকে মূল্যায়ন করছেন।
বিভিন্ন ইসলামী প্রোগ্রামে হুজুরের অংশগ্রহণ :
হুজুর ভোলা জেলার আনাচে কানাচে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে ঘুরেছিলেন বহুকালব্যাপী । আমি সেদিন সুদূর চর এক মাহফিলে আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। সেখানে যখন মাওলানা আব্দুল হক সাহেব আমার বাবা মাওলানা নুরুল হক সাহেবের পরিচয় দিয়ে আমাকে আলোচনা আহবান করলেন, তখন আমি নিজ চক্ষুতে দেখেছি অনুভব করেছি যে সে অঞ্চলের মানুষ হুজুরকে কত মহব্বত করেন ! আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম এখানে কি হুজুর কোন কেরাত প্রশিক্ষণ চালিয়েছেন ? তখন তারা বললেন এ মাঠেই হুজুর প্রধান অতিথি হিসেবে আমাদেরকে অনেক নসিহাত পূর্ণ কথা বলেছিলেন তখন থেকে আমাদের হুজুরের প্রতি মহব্বত ও ভালোবাসা।
চরফ্যাশনে স্থায়ী ইদারা ক্যাম্প উদ্বোধন :
হুজুর ১৯৭৩ ইং সনে চরফ্যাশনে স্থায়ীভাবে শাখা ইদারা উদ্বোধন করেন। যার পরিচালনায় ছিলেন তার প্রিয় ভাজন ছাত্র মাওলানা ফাসিউল আলম সাহেব এবং বর্তমানে একটা ভবন নির্মাণ করে দিয়েছেন তার ছাত্র চরফেশনের গর্ভ এমপি জ্যাকব সাহেব।
ইদারা মাদ্রাসা মসজিদ নির্মাণ :
ইদারা মাদ্রাসা ঘর নির্মাণের পর যখন ছাত্রদের আনাগনায় মুখরিত হয়ে উঠতেছিল তখন মাদ্রাসার পাশে একটি মসজিদ নির্মাণ আবশ্যকীয় হয়ে পড়ে কেননা মাদ্রাসার আঙ্গিনা থেকে দূরে অন্য জায়গায় গিয়ে নামাজ আদায় তা পড়ালেখার মধ্যে ব্যাঘাত পরিলক্ষিত হয়। তাই হুজুর সকলের পরামর্শক্রমে এলাকাবাসী ও ছাত্রদেরকে নিয়ে মসজিদ নির্মাণ এর কাজ শুরু করেন তাতে অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই মসজিদের পূর্ণ তৈরি সম্পন্ন হয় । সর্বপ্রথম এ মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ব্যবস্থায়ী ছিল। পরবর্তীতে জুমার নামাজ সহ ব্যবস্থাপনা চালু করা হয়।
ইদারা স্কিম পরিচালনার জন্য কেন্দ্রীয় মতবিনিময় সভা আয়োজন :
ঢাকার শেওড়াপাড়া হাফিজুল্লাহ হাফিজিয়া মাদ্রাসায় তার বিশিষ্ট ছাত্রবৃন্দ ও সহযোগীদেরকে নিয়ে ২০০১ সালে একটি মত বিনিময় সভার আয়োজন করেন। সেখানে আওলাদের রাসুল আল্লামা আনোয়ার হোসেন তাহের জাবেরী এবং গুলশান সেন্টার মসজিদের খতিব ও উত্তর বাড্ডা কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আল্লামা শামসুল হক সাহেব উপস্থিত ছিলেন। তারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে কোরআনের খেদমতে ইদারা মাদ্রাসাকে চালু রাখা প্রয়োজন। তাই সকলে এর খেদমতে অংশগ্রহণ করবেন।
দুর্ঘটনা :
ঢাকার গাজীপুর চৌরাস্তায় তিনি একটি বাসে ওঠার সময় হঠাৎ করে পড়ে যান। সেখান থেকে তার এ দুর্ঘটনা পরবর্তীতে অনেক দিন পর্যন্ত তাকে কষ্ট দেয় এবং তিনি বিছানায় শায়িত থাকেন।
রোগাক্রান্ততা :
হুজুর দুর্ঘটনায় শিকার হওয়ার পর থেকে বাড়িতেই শায়িত থাকতেন কিন্তু ২০০৫ জুন মাসের দিকে হুজুরের অবস্থা অবনতির দিকে যাচ্ছিল তাই তার নিজস্ব ডাক্তারকে খবর দেওয়া হয়। গজারিয়া থেকে তিনি এসে হুজুরের অবস্থা আশঙ্কাজন বুঝে তিনি নিকটস্থ মানিকার হাট বাজারে কয়েকজনকে বললেন ইদারা হুজুরের কত দিন বাঁচে আল্লাহ জানেন তবে তার অবস্থা আমার মনে হয় শেষের দিকে। কিছু মানুষের মুখে হুজুরের সাহেবজাদা মাওলানা মুবারাকুল কারীম এ কথা শুনে তিনি বাসায় এসে ভেঙ্গে পড়েন ।
ইন্তেকালের পূর্ব দিন :
ইন্তেকালের পূর্ব দিন মঙ্গলবার তিনি নিজের অবস্থা বুঝতে পেরে ট্যাপ রেকর্ডারে একটি গজল বারবার শুনতে ছিলেন সেটি হল টিক টিক টিক টিক যেই ঘড়িটি বাজে টিক টিক বাজে কেউ কি জানে সেই ঘরিটা লাগবে কয়দিন কাজে। সন্ধ্যায় তার অবস্থা অনুভব করে তার ইদারা জীবনের একমাত্র প্রিয় ব্যক্তি কারী নুরুল ইসলাম সাহেব বাসায় থেকে যান। আর তার পাশে বসে জিকির করতে থাকেন। যখন নুরুল ইসলাম সাহেব মাগরিবের নামাজ পড়তে যান এরই মাঝে হুজুরের জবান বন্ধ হয়ে যায়। চারদিক থেকে হুজুরের একান্ত ছাত্রবৃন্দ আগমন করতে থাকেন হুজুরকে আবারো পড়তে দেখা যায় যে তিনি ঠোঁট নাড়াচ্ছেন, জিকির করছেন। সারারাত তার কাছে নুরুল ইসলাম সাহেব বসে বসে জিকির করছিলেন হুজুর ও যেন তার সাথে মিলিয়ে জিকির করছিলেন।
ইন্তেকালের পূর্ব দিনের ওসিয়ত :
ইন্তেকালের পূর্ব দিন যখন আমরা ছোট ভাইয়েরা কান্নাকাটি করছিলাম ,মায়ের চিন্তিত মনোভাব দেখে আমরা ছোটরা একবার বাবার কাছে যাই আবার মায়ের কাছে আসি তখন মা-বাবাকে বললেন ওরা সবাই তো কান্নাকাটি করে আপনার অবস্থাও তেমন ভালো কিছু বুঝতেছি না আপনি যদি চলে যান ওরা তো ছোট আমি ওদেরকে নিয়ে কি করব ? আপনি এখন যদি আমাকে না বলেন তাহলে আমি কিভাবে কি বুঝবো ?
তখন হুজুর বললেন- আমি আমার সমস্ত সম্পদ ভাগ করে দিয়েছি। সবাই এগুলোতে মিলেমিশে থাকবে। আর ওরা তো ছোট আল্লাহ ওদেরকে মানুষ করবেন। হুজুরের আন্তরিক দোয়ার বদৌলতে আমরা যে কিভাবে ছোট থেকে এ পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করেছি এবং আল্লাহর মেহেরবানীতে ভালো আছি এটা সম্পূর্ণটা আল্লাহ সুবাহানাহুওয়া তা'আলারই একটি রহমতের নমুনা।
ইন্তেকাল :
২৯ জুন ২০০৫ রোজ বুধবার দুপুর ১:৫৫ মিনিটে
এ ইসলামের মহান খাদেম আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। আমরা হযরতের মাগফেরাত ও জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করি তার অসম্পূর্ণ কাজ সমূহ যেন আল্লাহ তার নিজ কৃপায় পূর্ণ করেন সে প্রত্যাশা কামনা করি।
শোকের বন্যা :
হুজুরের মৃত্যু সংবাদ চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লে ভোলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ে শোকের বন্যা। কেউ কেউ বিশ্বাস করতে পারলেন না হুজুর এত তাড়াতাড়ি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন! যিনি যেখানে যে কাজে ছিলেন সেখান থেকে সে কাজ ফেলে শোকে অশ্রুপাত করতে লাগলেন। সকলের মুখে একই কথা আমরা আজ আমাদের মনের মানুষকে হারালাম চারিদিকে শুধু আহাজারি। ওগো হুজুর আমাদেরকে ফেলে আজ আপনি কোথায় চলে গেলেন? কথায় বলে "অল্প সুখে কাতর অধিক সুখে পাথর" এলাকার কিছু সংখ্যক মানুষ ও তার ছাত্রবৃন্দ যাদের সাথে হুজুরের সম্পর্ক ভালো ছিল তাদের মধ্যে হুজুরের বিয়োগ ব্যাথা ও অন্তরের এমন অবস্থা অবলোকন করা গিয়েছিল। তারা তখন তাদের স্বাভাবিক মন মানসিকতা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছিল হুজুরের মৃত্যুতে এলাকায় প্রকাশ পেল এক বিশাল শূন্যতা এবং নিস্তব্ধতা। তিনি সকলের কাছ থেকে শেষ বিদায় নিয়েছিলেন। আর কখনো ফিরে আসবেন না। আর তাকে দেখা যাবে না। সকলকে শোক সাগরে ভাসিয়ে তিনি যে এমন ভাবে পাড়ি জমাবেন তা কখনো কেউ চিন্তা করেননি। আমাদের জেন মনে হচ্ছিল আব্বু ঢাকায় গেছেন আবার ফিরে আসবেন। আমাদের জন্য ফল নিয়ে আসবেন কিন্তু তিনি যে না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন ! তাই তো কবির একটি কথা বারবার মনে পড়ে…..!
"এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ
মরনের তাহাই তুমি করে গেলে দান"।
জানাজা ও দাফন :
হুজুরের প্রতিষ্ঠিত ইদারার মূল কেন্দ্র মাদ্রাসায় বৃহস্পতিবার সকাল 10:30 মিনিটে জানাজার জন্য ভোলা জেলার আনাচে-কানাচে থেকে ছুটে আসেন সকল স্তরের মানুষ পঙ্গপালের মতো। একজন ছাত্র বলেন যে আমি যেটি লক্ষ্য করেছি তা হলো হুজুরের জানাজার নামাজে সবচেয়ে বেশি উপস্থিত ছিল তারা আলেম-ওলামা ছাত্রবৃন্দ। জানাজার নামাজের ইমামতি করেন সর্বসম্মতিক্রমে মাওলানা ওয়াজিউল্লাহ সাহেব। হুজুরের বড় সাহেবজাদা। তার জানাযার নামাজের সময় হালকা বৃষ্টি অনুভূত হয়েছিল। কিন্তু যখন দাফন কাফনের জন্য তার লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন বৃষ্টি থেমে যায়। তাতে হুজুরের দাফন কার্য সম্পাদন করা সহজে সম্ভব হয়েছিল।
খাবারের
সময়ে সুন্নতের
প্রতি গুরুত্ব
:
পূর্বে উল্লেখ
করেছিলাম যে
তিনি খাবারের সময়
খাবারের সকল
সুন্নতগুলো আদায়
করার চেষ্টা করতেন।
তিনি সবসময় সমতল
ভূমিতে বসে খাবার
খেতেন। চেয়ার টেবিলে
বসে খাবার খাওয়াকে
অপছন্দ করতেন। ঝুটা
একটি শুকনো পাত্রে
রাখতেন। পানির
পাত্রে এসব ঝুটা
রাখতে নিষেধ করতেন।
কেননা ঝুটা ও
উচ্ছিষ্ট খাবার
বিড়াল ও কুকুরের
আহার। তিনি সবসময়
মজলিসের ডান
দিক থেকে খাবার
পরিবেশন এর
পরামর্শ দিতেন।
নেয়ামতের
কদর :
তিনি খাবার
শেষে যদি একটি
ভাতও পড়তো তা
তুলে খেয়ে নিতেন।
নেয়ামতের কদর
করার জন্য তিনি
সর্বদা চেষ্টা করতেন।
বাসায় কখনো কোন
কিছু অপচয় করতে
দিতেন না। নষ্ট
খাবার একটি পাত্রে
রাখা হতো এবং
কুকুর খেয়ে ফেলত
। কোন অনুষ্ঠান
হলে অনুষ্ঠান শেষে
অতিরিক্ত খাবার
থাকলে তা পাশের
বাড়ির লোকদের কে
দিয়ে দিতেন।
মিষ্টান্ন
খাবার :
তিনি চা
খেতে পছন্দ করতেন।
তিনি একটু মিষ্টি
বেশি খেতে পছন্দ
করতেন। মিষ্টান্ন জাতীয়
খাবার ফিরনি পায়েস
ইত্যাদি পছন্দ
করতেন।
সুন্নাহ
এর অনুসরণের
জীবন :
তিনি সবসময়
ইসলামী শরীয়ত সুন্নাহ
ও সকল নিয়মকানুন
পালন করে জীবন
যাপন করতে পছন্দ
করতেন। তিনি মেসওয়াক
করতেন। এমনকি আরো
অনেক ছোট থেকে
ছোট সুন্নাহ আদায়ের
তিনি সচেষ্ট ছিলেন।
তিনি সব সময়
সুন্নাহ এর
অনুসরণ এর জীবন
পরিচালনা করার
চেষ্টা করতেন।
আচার ব্যবহার
:
তিনি সবার
সাথে সুন্দর ব্যবহার
করতেন। কারো সাথে
প্রথম পরিচিত হলে
তার কথা আগে
শ্রবণ করে পরে
তিনি তাকে পরামর্শ
বা করনীয় সুন্দর
ভাষায় ব্যক্ত করতেন।
কারো সাথে হঠাৎ
করেই রেগে যেতেন
না। মাঝে মাঝে
অন্যায়ের প্রতিবাদে
রেগে গেলেও তা
সাময়িক রাগ
ছিল পরে কিন্তু
তা ভুলে যেতেন।
খানাপিনা
:
তিনি যখন
থানা-পিনা করতেন
আল্লাহর নাম
নিয়ে শুরু করতেন।
তার একান্ত ছাত্র
মাওলানা আব্দুস
শহীদ সাহেব বলেন
তিনি যখন পান
খেতেন এমনকি তখনও
তিনি বিসমিল্লাহ বলে
পান খাওয়া শুরু
করতেন।
সময়ানুবর্তিতা
:
তিনি সর্বদা
সময়কে গুরুত্ব দিতেন।
সময়মতো সময়ের
কাজ সম্পাদন করতেন
এবং তিনি বলতেন
খানার সময় খানা
কাজের সময় কাজ
করবে তাহলে দেখবে
তোমার জীবনে অনেক
বরকত হাসিল করতে
সক্ষম হবে। তিনি
একজন সময়ানুবর্তী লোক
ছিলেন।
অহংকার
বিমুখতা :
তিনি কোন
অহংকার করতেন না
। তার মধ্যে
অহংকারের বিন্দু
পরিমাণও লেস
পাওয়া যায়নি। অনেকেই
রয়েছে বিদ্যার কারণে
সাধারণ ব্যক্তিদের সাথে
অহংকার করে বসে
কিন্তু তিনি ছিলেন
সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।
ইদারা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার
পরও তার কিছু
বইতে তিনি শুধু
লেখকের নামে মোহাম্মদ
নূরুল হক লিখতেন।
খতিব পদে ৪৫ বছর :
এই মহান
দায়ী তার একান্ত
মুহিব্বিন জনাব
মরহুম দলিলুর রহমান
পণ্ডিত সাহেবের ডাকে
সাড়া দিয়ে নুর
মিয়ার হাট ঈদগাহ
ময়দানে ১৯৬০
সাল থেকে ২০০৫
সন পর্যন্ত ঈদের
সালাতের ইমামতি
করেছিলেন ।
২০০১ সাল থেকে
এক্সিডেন্টের পর
শুধুমাত্র আলোচনা
করতেন এবং তার
যোগ্য ছেলেদের কে
দিয়ে সেখানে নামাজ
পড়াতেন।
পরিশেষে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে আরজ এই যে তিনি যেন ইদারার হুজুরকে আল্লামা নুরুল হক (রহ.) কে জান্নাতুল ফেরদাউস এর
উচ্চ মাকাম দান করেন এবং তার ইদারাকে কেয়ামত পর্যন্ত আরও ব্যাপকভাবে চালু রাখেন। আমীন।
মোহাম্মদপুর । ক্যামব্রিয়ান স্কুল এন্ড কলেজ, ঢাকা।
Comments
Post a Comment