ডাকাতি এক ধরনের অপরাধ। কোনো মানুষের উপর বল প্রয়োগ করে, বল প্রয়োগের ভয় দেখিয়ে অথবা তাকে ভয়ভীত অবস্থার মধ্যে ফেলে, তার থেকে মুল্যবান দ্রব্যাদি সরিয়ে ফেলাই ডাকাতি। সাধারণ আইন অনুসারে ডাকাতিকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এভাবে যে, কোনো ব্যক্তি থেকে তার এখতিয়ারে থাকা সম্পত্তি নেওয়া বা কোনো ব্যক্তিকে ভয় বা বলপূর্বক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা নামই ডাকাতি। দেশভিত্তিক আদালতের আইন অনুসারে ডাকাতির সংজ্ঞা সম্পুর্ণভাবে নাও মিলতে পারে। ডাকাতি তার হিংস্র স্বভাবের জন্য চুরি থেকে আলাদা।
কুরআনের পরিভাষায় ডাকাতি ও লুটতরাজকে মুহারিব বলা হয়। এদের শাস্তি সম্পর্কে কুরআনে উল্লেখিত হয়েছে,
إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلَافٍ أَوْ يُنفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ۚ ذَٰلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا ۖ وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ
"যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং যমীনে ফাসাদ করে বেড়ায়, তাদের আযাব কেবল এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে কিংবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদেরকে দেশ থেকে বের করে দেয়া হবে। এটি তাদের জন্য দুনিয়ায় লাঞ্ছনা এবং তাদের জন্য আখিরাতে রয়েছে মহাআযাব।" (সূরা মায়িদাহ- ৩৩)
ইমরান ইবনুল হুসায়ন (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ যে ব্যক্তি ছিনতাই ও লুটতরাজ করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। (জামে আত-তিরমিযী ১১২৩; মিশকাত ২৯৪৭; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৩৯৩৭)
‘আদী ইবনু সাবিত (রহঃ)-এর নানা ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু ইয়াযীদ আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লুটতরাজ করতে এবং জীবকে বিকলাঙ্গ করতে নিষেধ করেছেন। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২৪৭৪)
রাসূল (সাঃ) লোকদের বাইয়াত গ্রহণ করতেন এই শর্তে, যে তারা ডাকাতি করবে না।
কুতাইবাহ ইবনু সাঈদ (রহঃ) ও মুহাম্মাদ ইবনু রুমূহ (রহঃ) … উভয়ে উবাদাহ ইবনু সামিত (রাযিঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি সেসব নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ছিলাম, যারা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট বাই’আত নিয়েছিলেন। আমরা শপথ নিলাম যে, আমরা আল্লাহর সাথে কোন কিছু শারীক করবো না, ব্যভিচার করবো না, চুরি করবো না, কাউকে হত্যা করবো না- যেগুলো (যাদেরকে হত্যা করতে) আল্লাহ নিষিদ্ধ করেছেন। কিন্তু ন্যায়সঙ্গতভাবে (অর্থাৎ- কিসাস তথা অবৈধ হত্যার পরিবর্তে বা মুরতাদ হলে বা বিয়ের পর যিনা করলে হত্যা করবে)। আর ডাকাতি করবো না ও কোন প্রকার নিষিদ্ধ কর্মও করবো না। যদি আমরা ঐরূপ কার্যাবলী না করে চলতে পারি তবে আমাদের জান্নাত মিলবে। আর যদি আমরা উল্লিখিত অপরাধের কোনটিতে লিপ্ত হই, তবে এর ফায়সালা আল্লাহর কাছেই। ইবনু রুমহ বলেন, এর ফায়সালা মহান আল্লাহর কাছেই। সহিহ মুসলিম (হাদিস একাডেমী ৪৩৫৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৩১৫, ইসলামিক সেন্টার ৪৩১৬)
কোনো মুমিন ডাকাতি করতে পারে না…
আবূ হুরায়রা (রা) সূত্রে রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেছেনঃ যখন কোন ব্যভিচারী ব্যভিচার করে, তখন সে মুমিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না, যখন চোর চুরি করে, তখন সে মুমিন অবস্থায় চুরি করে না, যখন কোন মদ্যপায়ী মদ পান করে, তখন সে মুমিন অবস্থায় মদপান করে না, আর যখন কোন ডাকাত লোক চক্ষুর সামনে ডাকাতি করে, তখনও সে মুমিন অবস্থায় ডাকাতি করে না। (সুনানে আন-নাসায়ী, হাদিস নং ৪৮৭০)
রাসূলুল্লাহ নিজের সম্পদ রক্ষাকে জিহাদ ঘোষণা দিয়েছেন, সেটা রক্ষা করতে গিয়ে মৃত্যুকে শহিদের মর্যাদা দিয়েছেন,
কাবূস ইব্ন আবুল মুখারিক (রহঃ) তাঁর পিতা হতে থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললো, যদি কেউ আমার মাল লুট করতে আসে, তখন আমি কি করবো? তিনি বললেনঃ তুমি তাকে আল্লাহ্র নামে উপদেশ দাও। সে ব্যক্তি বললো, যদি সে উপদেশ গ্রহণ না করে? তিনি বললেনঃ তবে তুমি তোমার অন্যান্য মুসলিম পড়শীর সাহায্য গ্রহণ কর। সে বললোঃ যদি ঐরূপ কোন মুসলিম প্রতিবেশী আমার না থাকে? তিনি বললেনঃ তবে তুমি শাসকের আশ্রয় গ্রহণ করবে। সে বললোঃ যদি শাসকও দূরে থাকে? তিনি বললেনঃ তবে তুমি তোমার মাল রক্ষার্থে জিহাদ করবে; যাতে তুমি শহীদ হয়ে যাও কিংবা তোমার সম্পদ রক্ষায় সক্ষম হও। (সুনানে আন-নাসায়ী, হাদিস নং ৪০৮১)
তিনি অপরের সম্পদ রক্ষায় মৃত্যুবরণ করাকেও শহিদী মৃত্যু আখ্যায়িত করেছেন,
ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ কোন ব্যাক্তি অপর ব্যাক্তির ধন-সম্পদ লুট করতে চাইলে সে তাতে বাধা দিতে গিয়ে তার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে নিহত হলে শহীদ গণ্য হয়। (বুখারী ২৪৮০, মুসলিম ১৪২, তিরমিযি ১৪১৮, ১৪১৯, ১২২০, ১৪২১, আবু দাউদ ৪৭৭১, ৪৭৭২)
‘আসিম ইবনু কুলাইব (রহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি একজন আনসারীর নিকট থেকে বর্ণনা করেন যে, আনসার লোকটি বললেন, একদা ‘আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে এক সফরে বের হই। লোকেরা ভীষণ খাদ্যকষ্টের শিকার হলো। ইতোমধ্যে কিছু সংখ্যক বকরী তাদের হস্তগত হয়। কিন্তু বণ্টনের পূর্বেই তারা সেগুলো লুণ্ঠন করে নেয়। আমাদের হাঁড়িগুলোতে গোশত টগবগ করে ফুটছিল। এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ধনুকে ভর দিয়ে এখানে উপস্থিত হলেন এবং ধনুক দিয়ে গোশতের হাঁড়ি উল্টিয়ে ফেলে দিয়ে তা বালির সাথে মিশিয়ে দিলেন। তিনি বললেনঃ এই লুটের মাল মৃত জন্তুর চেয়ে কিছু কম নয় অথবা বলেছেনঃ মৃত জন্তু এই লুটের মালের চেয়ে কিছু কম নয়। (সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
অধ্যায়ঃ ৯/ জিহাদ (كتاب الجهاد)হাদিস নম্বরঃ ২৭০৫)
ইসলামে ডাকাতির ৪ ধরনের শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যথা:
১. হত্যা ২. শূলবিদ্ধকরণ ৩. হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে দেওয়া ৪. নির্বাসিত করা।
ইসলামের ফুকাহায়েকেরাম বলেন, ডাকাতের অপরাধ অনুপাতে যে কোনো একটি শাস্তি প্রয়োগ করতে হবে। যে ডাকাত শুধু হত্যা করে ধন-সম্পদ না নেয়, তাকে হত্যা করা হবে। যে শুধু ধন-সম্পদ অপহরণ করে কিন্তু কাউকে হত্যা করে না, তাকে হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলা হবে। যে হত্যাও করে আবার ধন-সম্পদও নিয়ে যায়, তাকে শূলে চড়িয়ে হত্যা করা হবে। আর যে শুধু মানুষকে ভয় দেখায়, হত্যা বা ধন-সম্পদ নিয়ে যায় না, তাকে নির্বাসিত করা হবে। (আল মুগনি ১০/৩০৩,৩০৪)
মাওঃ ইনায়েতুল কারীম।
ইসলামী গবেষক ও লেখক।
লীড স্কলার ,ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ।
ক্যামব্রিয়ান কলেজ ,মোহাম্মদপুর ,ঢাকা।
Comments
Post a Comment