Skip to main content

যুগে যুগে জালেম শাসকদের ইতিহাস।

হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে আমার বান্দারা! আমি আমার নিজ সত্তার ওপর অত্যাচারকে হারাম করে নিয়েছি এবং তোমাদের মধ্যেও তা হারাম বলে ঘোষণা করছি। অতএব, তোমরা একে অপরের ওপর অত্যাচার কোরো না।

                                                                      (মুসলিম, হাদিস : ৬৪৬৬)

এর পরও যারা আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করে অন্যের প্রতি জুলুম করেছে, আল্লাহর শাস্তি তাদের বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়নি। ইতিহাসের পাতায় তাদের সেই জুলুম এবং ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণের শাস্তির কথা পরবর্তীদের জন্য সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। নিচে পৃথিবীর ক্ষমতাধর কয়েকজন যালিমের যুলুম তাদের পরিণতি তুলে ধরা হল |

ফিরাউন

ঔদ্ধত্য যুলুম :

إِنَّ فِرْعَوْنَ عَلَا فِي الْأَرْضِ وَجَعَلَ أَهْلَهَا شِيَعًا يَسْتَضْعِفُ طَائِفَةً مِنْهُمْ يُذَبِّحُ أَبْنَاءَهُمْ وَيَسْتَحْيِي نِسَاءَهُمْ إِنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ

ফিরাউন জমিনে ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করেছিল এবং সে তার অধিবাসীদের বিভিন্ন দলে বিভক্ত করেছিল। তাদের একটি শ্রেণীকে সে অত্যন্ত দুর্বল করে রেখেছিল, যাদের পুত্রদের সে যবাহ করত নারীদেরকে জীবিত রাখত। প্রকৃতপক্ষে সে ছিল বিপর্যয়সৃষ্টিকারী। (কাসাস ২৮ : )

وَقَالَ الْمَلَأُ مِنْ قَوْمِ فِرْعَوْنَ أَتَذَرُ مُوسَى وَقَوْمَهُ لِيُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَيَذَرَكَ وَآَلِهَتَكَ قَالَ سَنُقَتِّلُ أَبْنَاءَهُمْ وَنَسْتَحْيِي نِسَاءَهُمْ وَإِنَّا فَوْقَهُمْ قَاهِرُونَ

ফিরাউন সম্প্রদায়ের নেতৃবর্গ (ফিরাউনকে) বলল, আপনি কি মূসা তার সম্প্রদায়কে মুক্ত ছেড়ে দিবেন, যাতে তারা (অবাধে) পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে এবং আপনাকে আপনার উপাস্যদের বর্জন করতে পারে? সে বলল, আমরা তাদের পুত্রদের হত্যা করব এবং তাদের নারীদেরকে জীবিত রাখব, আর তাদের উপর আমাদের পরিপূর্ণ ক্ষমতা আছে। (আরাফ  : ১২৭)

 

কারূন তার পরিণতি

إِنَّ قَارُونَ كَانَ مِنْ قَوْمِ مُوسَى فَبَغَى عَلَيْهِمْ وَآَتَيْنَاهُ مِنَ الْكُنُوزِ مَا إِنَّ مَفَاتِحَهُ لَتَنُوءُ بِالْعُصْبَةِ أُولِي الْقُوَّةِ إِذْ قَالَ لَهُ قَوْمُهُ لَا تَفْرَحْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْفَرِحِينَ ... قَالَ إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَى عِلْمٍ عِنْدِي أَوَلَمْ يَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ قَدْ أَهْلَكَ مِنْ قَبْلِهِ مِنَ الْقُرُونِ مَنْ هُوَ أَشَدُّ مِنْهُ قُوَّةً وَأَكْثَرُ جَمْعًا وَلَا يُسْأَلُ عَنْ ذُنُوبِهِمُ الْمُجْرِمُونَ ... فَخَسَفْنَا بِهِ وَبِدَارِهِ الْأَرْضَ فَمَا كَانَ لَهُ مِنْ فِئَةٍ يَنْصُرُونَهُ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُنْتَصِرِينَ...تِلْكَ الدَّارُ الْآَخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ

কারূন ছিল মূসার সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি। কিন্তু সে তাদেরই প্রতি যুলুম করল। আমি তাকে এমন ধনভান্ডার দিয়েছিলাম, যার চাবিগুলো বহন করা একদল শক্তিমান লোকের পক্ষেও কষ্টকর ছিল। স্বরণ কর, তার সম্প্রদায় তাকে বলেছিল, দম্ভ করো না, নিশ্চয় আল্লাহ দাম্ভিকদেরকে পসন্দ করেন না। ...সে বলল, এসব তো আমি আমার জ্ঞানবলে লাভ করেছি। সে কি জানত না যে, আল্লাহ তার আগে এমন বহু মানবগোষ্ঠীকে ধ্বংস করেছিলেন, যারা শক্তিতেও তার অপেক্ষা প্রবল ছিল এবং লোকবলেও বেশি ছিল? অপরাধীদেরকে তাদের অপরাধ সম্পর্কে জিজ্ঞেসও করা হয় না। ...পরিণামে আমি তাকে তার প্রাসাদসহ ভূগর্ভে ধ্বসিয়ে দিলাম। তার স্বপক্ষে এমন কোন দল ছিল না যারা আল্লাহর শাস্তি থেকে তাকে সাহায্য করতে পারত এবং সে নিজেও পারল না আত্মরক্ষা করতে। ... ওই পরকালীন নিবাস তো আমি সেই সকল লোকের জন্যই নির্ধারণ করব, যারা পৃথিবীতে ঔদ্ধত্য দেখাতে ফাসাদ সৃষ্টি করতে চায় না। শেষ পরিণাম তো  মুত্তাকীদেরই অনুকূল থাকবে। (কাসাস ২৮ : ৭৬,৭৮,৮১,৮৩)

 

আখেরাতে যালেমের পরিণতি :

فلا تحسبن الله غافلا عما يعمل الظالمون إنما يؤخرهم ليوم تشخص فيه الأبصار، مهطعين مقنعي رؤوسهم لا يرتد إليهم طرفهم و أفئدتهم هواء.... وترى المجرمين يومئذ مقرنين في الأصفاد، سرابيلهم من قطران ...

তুমি কিছুতেই মনে করো না যালিমরা যা-কিছু করছে আল্লাহ সে সম্পর্কে বেখবর। তিনি তো তাদেরকে সেই দিন পর্যস্ত অবকাশ দিচ্ছেন, যে দিন চক্ষুসমূহ থাকবে বিস্ফারিত। ভীত-বিহবল চিত্তে আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা ছোটাছুটি করবে। নিজেদের প্রতি তাদের দৃষ্টি ফিরবে না এবং তাদের অন্তর হবে উদাস। ...সেদিন তুমি অপরাধীদের দেখবে শৃঙ্খলিত অবস্থায়। তাদের জামা হবে আলকাতরার আর আগুন তাদের মুখমন্ডল আচ্ছন্ন করবে। ... এটা এজন্য যে, আল্লাহ প্রত্যেকের কৃতকর্মের প্রতিফল দিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণ করেন। এটা মানবজাতির জন্য এক বার্তা, যাতে এর দ্বারা তারা সতর্ক হয় এবং জানতে পারে যে, তিনি একমাত্র ইলাহ এবং যাতে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ উপদেশ গ্রহণ করে।  (ইবরাহীম ১৪ : ৪২,৪৩, ৪৯-৫২)

وَقُلِ الْحَقُّ مِن رَّبِّكُمْ فَمَن شَاء فَلْيُؤْمِن وَمَن شَاء فَلْيَكْفُرْ إِنَّا أَعْتَدْنَا لِلظَّالِمِينَ نَاراً أَحَاطَ بِهِمْ سُرَادِقُهَا وَإِن يَسْتَغِيثُوا يُغَاثُوا بِمَاء كَالْمُهْلِ يَشْوِي الْوُجُوهَ بِئْسَ الشَّرَابُ وَسَاءتْ مُرْتَفَقاً }الكهف

বলে দাও, তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তো সত্য এসে গেছে। এখন যার ইচ্ছা ঈমান আনুক এবং যার ইচ্ছা কুফর অবলম্বন করুক। আমি যালেমদের জন্য আগুন প্রস্ত্তত করে রেখেছি, যার প্রাচীর তাদেরকে বেষ্টন করে রাখবে। তারা পানি চাইলে তাদেরকে তেলের তলানী সদৃশ পানি দেয়া হবে, যা তাদের চেহারা ঝলসে দেবে। কতই না মন্দ সে পানীয় এবং কতই না নিকৃষ্ট বিশ্রামস্থল! (কাহ্ফ ১৭: ২৯)

যালিম সফল হয় না :

فسوف تعلمون من تكون له عاقبة الدار إنه لا يفلح الظالمون

 তোমরা অচিরেই জানতে পারবে, কার পরিণাম মঙ্গলময়। যালিমরা কখনও সফল হবে না। (আনআম : ১৩৫)

وَسَيَعْلَمُ الَّذِينَ ظَلَمُوا أَيَّ مُنْقَلَبٍ يَنْقَلِبُونَ

যারা যুলুম করেছে তারা অচিরেই জানতে পারবে কোন্ পরিণামের দিকে তারা ফিরে যাচ্ছে। (শুআরা ২৬ : ২২৭)

অবশেষে কর্তৃত্ব  মুমিনদের :

وَنُرِيدُ أَنْ نَمُنَّ عَلَى الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا فِي الْأَرْضِ وَنَجْعَلَهُمْ أَئِمَّةً وَنَجْعَلَهُمُ الْوَارِثِينَ

আমি ইচ্ছা করলাম, যমীনে যাদেরকে দুর্বল করে রাখা হয়েছে তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে, তাদেরকে নেতৃত্ব দান করতে, উত্তরাধিকারী করতে। (কাসাস ২৮: )

قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ اسْتَعِينُوا بِاللَّهِ وَاصْبِرُوا إِنَّ الْأَرْضَ لِلَّهِ يُورِثُهَا مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ

মূসা তার সম্প্রদায়কে বলল, আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা কর এবং ধৈর্য ধারণ কর; যমিন তো আল্লারই। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা এর উত্তরাধিকারী করেন এবং শুভ পরিণাম তো মুত্তাকীদের জন্য। (আরাফ : ১২৮)


লেখক : মাওঃ ইনায়েতুল কারীম। 

ইসলামী গবেষক ও লেখক। 

লীড স্কলার , ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ।

ক্যামব্রিয়ান কলেজ ,মোহাম্মদপুর, ঢাকা।


Comments

Popular posts from this blog

আখেরি চাহার সোম্বা কী?

 আজ পবিত্র আখেরি চাহার সোম্বা!  আখেরি চাহার সোম্বা কী?   *আখেরি চাহর শোম্বা মূলত আরবি ও ফার্সি বাক্য। প্রথম শব্দ ‘আখেরি’ আরবি ও ফার্সিতে পাওয়া যায়। যার অর্থ হলো- শেষ। ফার্সি ‘চাহর’ শব্দের অর্থ হলো- সফর মাস এবং ফার্সি ‘শোম্বা’ শব্দের অর্থ হলো- বুধবার। অর্থাৎ ‘আখেরি চাহর সোম্বা’র অর্থ দাঁড়ায়- সফর মাসের শেষ বুধবার। দিনটিকে মুসলিম উম্মাহ খুশির দিন হিসেবে জানে এবং খুশির দিন হিসেবেই উদযাপন করে থাকেন। আখেরি চাহার সোম্বা কী? রসূলুল্লাহ (সা.) এর পবিত্র জীবনের প্রতিটি কথা, প্রতিটি কাজ আর সমস্ত আচার-ব্যবহার, চাল-চলন, গতি-বিধি, পদক্ষেপ, সময়-ক্ষণ তথা সমগ্র জীবনই উত্তম আদর্শের অনুপম নিদর্শন। যা কোরআন শরীফে নানা আঙ্গিকে ব্যক্ত হয়েছে। তবে মক্কায় তার নবুওয়্যাত- রেসালত জীবনের ১৩টি বছরই তাঁকে মক্কার কাফের কোরাইশদের নানামুখী কঠোর নির্যাতন নীরবে সহ্য করতে হয়েছে। হিজরতের পর মদীনায় আগমনের পরও রাসূলুল্লাহ (সা.) ইহুদী-মোনাফেকদের নতুন ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। মক্কার কাফেররা তাকে, মদীনার ইহুদী মোনাফেকদের যোগ সাজশে স্বস্তিতে-শান্তিতে থাকতে দেয়নি এবং তারা সর্বদা আগ্রাসী ষড়যন্ত্র লিপ্ত থ...

ইসলামিক গল্প (1) হিফজের স্বপ্ন। মাওঃ ইনায়েতুল কারীম ।

                                       “হিফজের স্বপ্ন” রিমা নবম শ্রেণির ছাত্রী। বয়স মাত্র চৌদ্দ, কিন্তু আকাঙ্ক্ষা অনেক বড়। প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে সে পাশের মাদরাসায় যায় কুরআন তিলাওয়াত শেখার জন্য। তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন—একদিন পুরো কুরআন হিফজ করা। একদিন বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন এসেছিল। তারা আড্ডায় বসে বলল, — “মেয়েদের এত পড়ালেখা কিসের? বিয়ে দেবে হলেই হলো!” রিমার মা মৃদু হাসলেন, বললেন, — “রাসূল ﷺ বলেছেন, ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রতিটি মুসলিম নর-নারীর উপর ফরজ’। মেয়ে মানুষ জ্ঞান থেকে পিছিয়ে থাকতে পারে না।” সবাই চুপ হয়ে গেল। রিমার চোখে আত্মবিশ্বাস জ্বলজ্বল করছিল। রাতের নামাজ শেষে সে দীর্ঘ দোয়া করল, — “হে আল্লাহ! আমাকে কুরআনের হাফিজা বানিয়ে দিন। আমি আপনার কালাম দিয়ে মানুষের জীবন বদলাতে চাই।” দিনগুলো কেটে যায়। রিমা ধৈর্য, আমল ও চেষ্টা—এই তিন অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে চলে। স্কুলের পড়া, ঘরের কাজ, আর মাদরাসার হিফজ—সব সামলে চলে সে। মাঝে মাঝে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন মনে পড়ে যায়...

ইসলামিক গল্প (২) একটি খেজুর গাছ। মাওঃ ইনায়েতুল কারীম।

একটি খেজুর গাছ :  একদিন এক ছোট গ্রামে একজন দরিদ্র কৃষক বাস করত। তার নাম ছিল আবদুল্লাহ। আল্লাহর প্রতি তার ভরসা ছিল অটুট, কিন্তু জীবনে দারিদ্র্য তাকে সবসময় কষ্ট দিত। একদিন সে তার ছোট ছেলেকে নিয়ে বাগানে কাজ করতে গেল। সেখানে একটি শুকনো খেজুর গাছ দাঁড়িয়ে ছিল—বছরের পর বছর ফল দিচ্ছিল না। ছেলেটি বলল, “আব্বা, এই গাছটা কেটে ফেলি না কেন? এর কোনো উপকার নেই।” আবদুল্লাহ মৃদু হেসে বললেন, “না বেটা, হয়তো আল্লাহ একদিন এই গাছকে আবার জীবিত করে তুলবেন। আল্লাহর রহমত থেকে কখনো হতাশ হও না।” কয়েকদিন পর প্রচণ্ড বৃষ্টি হলো। বৃষ্টির পর সবাই দেখল, সেই শুকনো খেজুর গাছে নতুন পাতা গজিয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই তাতে মিষ্টি খেজুর ধরল। গ্রামের লোকজন অবাক হয়ে বলল, “আবদুল্লাহ ভাই, আপনি গাছটা কেটে ফেলেননি বলে আল্লাহ আপনাকে বরকত দিয়েছেন।” আবদুল্লাহ বললেন, “আল্লাহর রহমতে কিছুই অসম্ভব নয়। ধৈর্য আর আশা—এই দুই-ই মুমিনের সম্পদ।