থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপন : ইসলাম কি বলে ?
মাওলানা ইনায়েতুল কারীম।
থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপন বর্তমান বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ট্রেন্ড হয়ে উঠেছে। খ্রিস্টানদের পাশাপাশি মুসলিমরাও অপ্রত্যাশিতভাবে দিন দিন এই উৎসবে জড়িয়ে পড়ছে। অনুষ্ঠানটি জর্জিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে প্রতিবছর ডিসেম্বর মাসের শেষ তথা ৩১ তম রাতে উদযাপন করা হয়। বেশিরভাগই যুবক, ছেলে এবং মেয়ে উভয়ে এখন নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে এবং কিছু কার্যকলাপ উপভোগ করার জন্য রাতটি উদযাপন করতে পাগল হয়ে উঠছে। এ ধরনের প্রবণতা ও উৎসবের ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশনা জানা সময়ের দাবি। আমার এ লেখাটির লক্ষ্য হলো কোরআন ও সুন্নাহ অনুসারে থার্টিফার্স্ট নাইট তথা নববর্ষ উদযাপনের বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করা।
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসেবে যেকোনো পরিস্থিতিতে আমাদেরকে পথ দেখায়। ইসলামের ইতিহাস অনুসারে আমরা খুঁজে পাই না যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম ও তার সাহাবীগণ থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপন করেছেন। এটি ইসলামের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নয়। ইসলামী সংস্কৃতি কোরআন এর নির্দেশনা এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু সাল্লাম এর সুন্নাহ দ্বারা সীমাবদ্ধ।
জর্জিয়ান ক্যালেন্ডারের পাশাপাশি ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তা'আলা চালু করা একটি ইসলামিক চন্দ্র ক্যালেন্ডার রয়েছে। ইসলামী চন্দ্র বর্ষ শুরু হয় মহাররম মাস দিয়ে এবং শেষ হয় জিলহজ মাসে। তাফসীরে কিতাবে উল্লেখ রয়েছে যে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হলো - দিন শুরু হয় সুবহে সাদিকে তথা সূর্য উদয় থেকে। তাই মধ্যরাতে ইসলামিক ক্যালেন্ডার এ কোন বিশেষ অনুষ্ঠান নেই যা এ ব্যাপারে উদযাপন করা হবে এবং যায়। যদিও আরবি বর্ষপঞ্জি হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু শুরু করেছিলেন,তবুও আমরা তার আমলে নববর্ষকে স্বাগত জানানোর অনুষ্ঠান বা বছরের শেষ রাত্রে উদযাপন করতে পাইনি।
আমাদের সকলেরই জানা আছে যে, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু সাল্লাম যখন তার সাহাবীদের নিয়ে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন, তখন দেখতে পান ইহুদীরা কয়েকটি ঐতিহাসিক দিন উদযাপন করছে এবং সে অনুযায়ী আনন্দ করছে। তিনি মুসলমানদেরকে তাদের অনুসরণ না করার জন্য বলেছিলেন এবং বলেছিলেন আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য দুটি দিন দিয়ে তাদের স্থাপিত করেছেন যা উত্তম। ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহার দিন ( সুনানে আবু দাউদ )
উপরন্তু, থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপন ইসলামী সংস্কৃতি নয় বরং একটি খ্রিস্টান সংস্কৃতি। তাই এই উদযাপনটি যেকোনো মুসলিমকে এড়িয়ে চলতে হবে কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম স্পষ্টভাবে বলেছেন
যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের অনুকরণ করবে সে বিচারের দিন তথা হাশরের ময়দানে তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে (সুনানে আবু দাউদ)
অন্য আর এক বর্ণনায় এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু সালাম বলেছেন,
যে ব্যক্তি আমাদের ব্যতীত অন্যদের অনুকরণ করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়। তোমরা ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের অনুসরণ করো না। (সুনানে তিরমিজি )
অন্যদিকে পবিত্র কুরআনুল কারীমের মধ্যে স্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে-
হে ঈমানদারগণ ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা বাস্তবে একে অপরের মিত্র আর তোমাদের মধ্যে যে তাদের মিত্র তাহলে নিশ্চয়ই সে তাদেরই একজন। আল্লাহ জালেমদেরকে পথ দেখান না। (সূরা আল মায়েদা : ৫১)
এর পাশাপাশি আমাদের মনে রাখা উচিত যে নববর্ষ তথা থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপন আমাদের জীবনে ভালো কিছু নিয়ে আসে না। যদি কেউ বিশ্বাস করে যে এটি পরবর্তী বছরে তার জীবনে ভালো কিছু নিয়ে আসবে এবং তাকে যেকোনো ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে তাহলে তাকে বিশ্বাসী এবং মুসলমান হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত নয়। কেউ যদি এমন বিশ্বাস করে তাহলে এটি শিরকের ধারণার সাথে মিলবন্ধন থাকবে এবং সে মুশরিক হয়ে যাবে। আল্লাহর সাথে অংশীদারকারী হিসেবে পরিগণিত হবে। আর যে আল্লাহর সাথে অংশীদার করবে সে কখনোই ক্ষমা পাবে না।
তদুপরি, আমরা লক্ষ্য করতে পারি যে,আমাদের দেশে প্রতিটি থার্টিফার্স্ট নাইটে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে । মধ্যরাতে এ রাতটি উদযাপনের সময় মেয়েরা প্রায়ই বিপথগামী ছেলেদের দ্বারা হয়রানির শিকার হয় যা সমাজে কোন সচেতন মানুষের কাছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত।
পরিশেষে, আমরা একথা বলতে পারি যে কেউ যদি সত্যিই আল্লাহর প্রশংসা করতে চায় যেভাবে তিনি তাকে আরও একটি বছর বাঁচিয়ে রেখেছেন এবং আবার তার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন তাই তিনি কোরআন তেলাওয়াত করতে পারেন অথবা নফল সালাত আদায় করতে পারেন অথবা গরিব ও অভাবী লোকদের মাঝে দান খয়রাত করতে পারেন। ইসলামী ধারণা অনুযায়ী অন্যান্য কিছু জায়েজ তথা ভালো কাজ করতে পারেন।
এখন,সমালোচকদের দ্বারা একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে যে মুসলিমরা কেন জর্জিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে যখন তাদের নিজস্ব একটি ক্যালেন্ডার রয়েছে ? উত্তরটি খুবই সহজ। একটি সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণে কেউ সহজেই এটি খুঁজে পেতে পারে যে সমস্ত ধর্মীয় কার্যকলাপ যেমন নামাজ, সাওম, লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও একটি উত্তম রাত ।যে রাতে কোরআন নাযিল হয়েছিল। লাইলাতুল মেরাজে। আরবি চন্দ্র ক্যালেন্ডার অনুসারেই সীমাবদ্ধ।
প্রিয় পাঠক, এটি কেবলমাত্র হারাম কার্যকলাপ থেকে নিজেদেরকে বাঁচানোই নয় আমাদের চারপাশে বিশেষ করে আমাদের পরিবারকে বাঁচানো আমাদের কর্তব্য। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, হে ঈমানদারগণ তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার পরিজনকে সে আগুন থেকে রক্ষা করো যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর (সূরা তাহরীম:০৭)
তাই আমাদের উচিত আমাদের শিশু ও সন্তানদেরকে ইসলামের পরিবর্তে অন্য সংস্কৃতি ও প্রবণতা অনুসরণ করা তথা ফার্স্ট নাইট উদযাপনে জড়িত করা থেকে রক্ষা করা এবং সঠিক পথে যেন আমরা পরিচালিত হই সে প্রত্যাশা ও দোয়া করা।
Comments
Post a Comment