Skip to main content

মোহাররম মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ I মাওঃ ইনায়েতুল কারীম I

 

“দিন যায় রাত আসে। সপ্তাহ পেরিয়ে মাস আসে। ধীরে ধীরে তা-ও ফুরিয়ে যায়।”
এই কথাগুলোর মাঝে জীবনের বাস্তব রূপরেখা লুকিয়ে আছে। সময় চলে যায় নিরবধি ধারায়, কখনোই থেমে থাকে না। এক বছরের বারোটি মাস, এক মাসের চারটি সপ্তাহ, প্রতিটি সপ্তাহের সাতটি দিন—এই চক্রে আবর্তিত হয় আমাদের জীবন। আর এই আবর্তনের শেষে একদিন নিভে যায় জীবনের আলো। বুদ্ধিমান তো সেই ব্যক্তি, যে এই সময়ের মূল্য অনুধাবন করে এবং তা আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالأرْضِ وَاخْتِلافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِأُولِي الْأَلْبَابِ
“নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে নিদর্শন রয়েছে বোধশক্তিসম্পন্নদের জন্য।”
সূরা আলে ইমরান (৩): ১৯০

🔶 মোহাররমের পরিচয়

মোহাররম হল ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং এটি হারাম মাসগুলোর একটি। হারাম মাস বলতে সেই মাসগুলোকে বোঝানো হয়, যেগুলোতে যুদ্ধ-বিগ্রহ হারাম করা হয়েছে এবং যেগুলোর সম্মান কুরআন ও সুন্নাহতে বিশেষভাবে উল্লেখিত হয়েছে।

🔶 কোরআনের আলোকে মোহাররমের ফজিলত

🔹 ১. হারাম মাসের আলোচনা

📖 আল-কুরআন:

إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ۚ
ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ
– সূরা আত-তাওবা, আয়াত ৩৬

বাংলা অনুবাদ:
“আল্লাহর বিধানে মাসের সংখ্যা বারটি। আসমান ও জমিন সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর কিতাবে তা নির্ধারিত আছে। তার মধ্যে চারটি মাস পবিত্র (হারাম মাস)। এটাই সঠিক দ্বীন।”

📌 এখানে উল্লেখিত চারটি পবিত্র মাসের মধ্যে মোহাররম অন্যতম (অন্যান্য তিনটি: রজব, জিলকদ, জিলহজ্জ)।

🔶 হাদীসের আলোকে মোহাররমের ফজিলত

🔹 ১. আল্লাহর মাস মোহাররম

📖 হাদীস:

أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ صِيَامُ شَهْرِ اللَّهِ الْمُحَرَّمِ، وَأَفْضَلُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ صَلَاةُ اللَّيْلِ
(সাহিহ মুসলিম, হাদীস: 1163)

বাংলা অনুবাদ:
“রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মোহাররমের রোজা। আর ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম সালাত হলো রাতের তাহাজ্জুদ সালাত।”

📌 এই হাদীসে “شهر الله المحرم” (আল্লাহর মাস মোহাররম) বলে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ মর্যাদা বোঝানো হয়েছে।

🔹 ২. আশুরার দিন (১০ই মোহাররম) এর ফজিলত

📖 হাদীস:

صِيَامُ يَوْمِ عَاشُورَاءَ، إِنِّي أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ
(সহিহ মুসলিম, হাদীস: 1162)

বাংলা অনুবাদ:
“আশুরার দিনে রোজা রাখলে, আমি আল্লাহর কাছে আশা করি—এই রোজা আগের বছরের গুনাহ মাফ করিয়ে দেবে।”

🔹 ৩. আশুরার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

📖 হাদীস:

قَدِمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ المَدِينَةَ، فَرَأَى اليَهُودَ تَصُومُ يَومَ عَاشُورَاءَ، فَقالَ: ما هذا؟ قالوا: هذا يَومٌ صالِحٌ، هذا يَومٌ نَجَّى اللَّهُ بَنِي إسْرَائِيلَ مِن عَدُوِّهِمْ، فَصَامَهُ مُوسَى، قالَ: فأنا أَحَقُّ بمُوسَى مِنكُمْ، فَصَامَهُ، وَأَمَرَ بصِيَامِهِ.
(সহিহ বুখারি, হাদীস: 2004)

বাংলা অনুবাদ:
“রাসূল (ﷺ) মদিনায় আসলে দেখতে পেলেন, ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এটি কী?’ তারা বলল, ‘এটি একটি কল্যাণময় দিন, এই দিনে আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাঈলকে তাদের শত্রু থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন, এজন্য মূসা (আ.) রোজা রেখেছিলেন।’ তখন রাসূল (ﷺ) বললেন, ‘মূসার সঙ্গে তোমাদের চেয়ে আমার অধিক সম্পর্ক রয়েছে।’ অতঃপর তিনি নিজেও রোজা রাখলেন এবং উম্মতকেও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন।”

🔶 সুন্নাত: আশুরার দিনে একা রোজা নয়

📖 হাদীস:

لَئِنْ بَقِيتُ إِلَى قَابِلٍ لَأَصُومَنَّ التَّاسِعَ
(সহিহ মুসলিম, হাদীস: 1134)

বাংলা অনুবাদ:
“আগামী বছর যদি বেঁচে থাকি, তাহলে আশুরার (১০ তারিখের) সাথে নবম মোহাররম (তাসুয়া) তাও রোজা রাখব।”

📌 এখান থেকে বোঝা যায় যে, শুধু ১০ই মোহাররম নয়, বরং ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ তারিখ রোজা রাখা উত্তম।

🔶 সংক্ষিপ্তভাবে মোহাররমের ফজিলত

  1. হারাম মাস হওয়ায় এ মাসে পুণ্যের কাজ বেশি সওয়াবের, আর গুনাহেরও শাস্তি বেশি ভয়াবহ।

  2. রমজান ছাড়া সেরা রোজা—মোহাররম মাসে।

  3. আশুরার দিনে (১০ই মোহাররম) রোজা রাখলে বিগত এক বছরের গুনাহ মাফ হয়।

  4. আশুরার ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে (হজরত মূসা আ. এর কাহিনি)।

  5. রাসূল (ﷺ) এই মাসকে ‘আল্লাহর মাস’ বলে অভিহিত করেছেন।

🔚 উপসংহার

মোহাররম মাস হল সম্মানিত ও পবিত্র মাসগুলোর একটি। ইসলামী জীবনে এই মাসের গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। বিশেষত আশুরার দিন একটি অতীব ফজিলতপূর্ণ দিন, যেখানে আমরা অতীতের ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে ভবিষ্যৎকে সুন্দর করতে পারি। রাসূল (ﷺ)-এর শিক্ষা অনুসারে, এ মাসে রোজা রাখা, নেক কাজ বৃদ্ধি করা এবং গুনাহ থেকে বিরত থাকাই আমাদের জন্য উত্তম।

Comments

Popular posts from this blog

আখেরি চাহার সোম্বা কী?

 আজ পবিত্র আখেরি চাহার সোম্বা!  আখেরি চাহার সোম্বা কী?   *আখেরি চাহর শোম্বা মূলত আরবি ও ফার্সি বাক্য। প্রথম শব্দ ‘আখেরি’ আরবি ও ফার্সিতে পাওয়া যায়। যার অর্থ হলো- শেষ। ফার্সি ‘চাহর’ শব্দের অর্থ হলো- সফর মাস এবং ফার্সি ‘শোম্বা’ শব্দের অর্থ হলো- বুধবার। অর্থাৎ ‘আখেরি চাহর সোম্বা’র অর্থ দাঁড়ায়- সফর মাসের শেষ বুধবার। দিনটিকে মুসলিম উম্মাহ খুশির দিন হিসেবে জানে এবং খুশির দিন হিসেবেই উদযাপন করে থাকেন। আখেরি চাহার সোম্বা কী? রসূলুল্লাহ (সা.) এর পবিত্র জীবনের প্রতিটি কথা, প্রতিটি কাজ আর সমস্ত আচার-ব্যবহার, চাল-চলন, গতি-বিধি, পদক্ষেপ, সময়-ক্ষণ তথা সমগ্র জীবনই উত্তম আদর্শের অনুপম নিদর্শন। যা কোরআন শরীফে নানা আঙ্গিকে ব্যক্ত হয়েছে। তবে মক্কায় তার নবুওয়্যাত- রেসালত জীবনের ১৩টি বছরই তাঁকে মক্কার কাফের কোরাইশদের নানামুখী কঠোর নির্যাতন নীরবে সহ্য করতে হয়েছে। হিজরতের পর মদীনায় আগমনের পরও রাসূলুল্লাহ (সা.) ইহুদী-মোনাফেকদের নতুন ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। মক্কার কাফেররা তাকে, মদীনার ইহুদী মোনাফেকদের যোগ সাজশে স্বস্তিতে-শান্তিতে থাকতে দেয়নি এবং তারা সর্বদা আগ্রাসী ষড়যন্ত্র লিপ্ত থ...

ইসলামিক গল্প (1) হিফজের স্বপ্ন। মাওঃ ইনায়েতুল কারীম ।

                                       “হিফজের স্বপ্ন” রিমা নবম শ্রেণির ছাত্রী। বয়স মাত্র চৌদ্দ, কিন্তু আকাঙ্ক্ষা অনেক বড়। প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে সে পাশের মাদরাসায় যায় কুরআন তিলাওয়াত শেখার জন্য। তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন—একদিন পুরো কুরআন হিফজ করা। একদিন বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন এসেছিল। তারা আড্ডায় বসে বলল, — “মেয়েদের এত পড়ালেখা কিসের? বিয়ে দেবে হলেই হলো!” রিমার মা মৃদু হাসলেন, বললেন, — “রাসূল ﷺ বলেছেন, ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রতিটি মুসলিম নর-নারীর উপর ফরজ’। মেয়ে মানুষ জ্ঞান থেকে পিছিয়ে থাকতে পারে না।” সবাই চুপ হয়ে গেল। রিমার চোখে আত্মবিশ্বাস জ্বলজ্বল করছিল। রাতের নামাজ শেষে সে দীর্ঘ দোয়া করল, — “হে আল্লাহ! আমাকে কুরআনের হাফিজা বানিয়ে দিন। আমি আপনার কালাম দিয়ে মানুষের জীবন বদলাতে চাই।” দিনগুলো কেটে যায়। রিমা ধৈর্য, আমল ও চেষ্টা—এই তিন অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে চলে। স্কুলের পড়া, ঘরের কাজ, আর মাদরাসার হিফজ—সব সামলে চলে সে। মাঝে মাঝে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন মনে পড়ে যায়...

ইসলামিক গল্প (২) একটি খেজুর গাছ। মাওঃ ইনায়েতুল কারীম।

একটি খেজুর গাছ :  একদিন এক ছোট গ্রামে একজন দরিদ্র কৃষক বাস করত। তার নাম ছিল আবদুল্লাহ। আল্লাহর প্রতি তার ভরসা ছিল অটুট, কিন্তু জীবনে দারিদ্র্য তাকে সবসময় কষ্ট দিত। একদিন সে তার ছোট ছেলেকে নিয়ে বাগানে কাজ করতে গেল। সেখানে একটি শুকনো খেজুর গাছ দাঁড়িয়ে ছিল—বছরের পর বছর ফল দিচ্ছিল না। ছেলেটি বলল, “আব্বা, এই গাছটা কেটে ফেলি না কেন? এর কোনো উপকার নেই।” আবদুল্লাহ মৃদু হেসে বললেন, “না বেটা, হয়তো আল্লাহ একদিন এই গাছকে আবার জীবিত করে তুলবেন। আল্লাহর রহমত থেকে কখনো হতাশ হও না।” কয়েকদিন পর প্রচণ্ড বৃষ্টি হলো। বৃষ্টির পর সবাই দেখল, সেই শুকনো খেজুর গাছে নতুন পাতা গজিয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই তাতে মিষ্টি খেজুর ধরল। গ্রামের লোকজন অবাক হয়ে বলল, “আবদুল্লাহ ভাই, আপনি গাছটা কেটে ফেলেননি বলে আল্লাহ আপনাকে বরকত দিয়েছেন।” আবদুল্লাহ বললেন, “আল্লাহর রহমতে কিছুই অসম্ভব নয়। ধৈর্য আর আশা—এই দুই-ই মুমিনের সম্পদ।