Skip to main content

জাতীয় সংগীত কি সংস্কার করা প্রয়োজন নাকি না ? মাওঃ ইনায়েতুল কারীম ।

 কোটা সংস্কার দিয়ে শুরু করা রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিতে পতন হয়েছে স্বৈরাচার সরকারের। এরপর থেকে শুরু হয়েছে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে সংস্কার।

গত তিন সেপ্টেম্বর 2024 (মঙ্গলবার) বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী সংবিধানের সঙ্গে জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবি জানান। এরপরই শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। 

নেটিজেনরা বলছেন, রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ চলছে এখানে সবারই পরামর্শ-দাবি থাকতে পারে। আযমী একটি প্রস্তাবনা দিয়েছেন এটা গ্রহণ করা না করার বিষয়ে সরকার আলোচনা করতে পারে। 

আরেকটি পক্ষ বলছে- জাতীয় সংগীত আমাদের আবেগের জায়গা এটা পরিবর্তন করার দাবি কেন সে তুলবেন ?  

এবার আসি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত কেন পরিবর্তন করা প্রয়োজন ?

১. জাতীয় সংগীতের জন্ম ১২০ বছর আগে, অর্থাৎ বাংলাদেশ জন্মের ৬৬ বছর আগে। 

২. এটিতে বাংলাদেশের নাম নাই, যা আমাদের হীনমন্যতায় ভোগায়।

৩. সংগীতটিতে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের উল্লেখ নাই। আমাদের ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র নয় কি?

৪. এটিতে বাউলশিল্পী গগন হরকরার গান "আমি কোথায় পাব তারে" থেকে আইডিয়া ও সুর চুরি প্রমাণিত ও স্পষ্ট, যদিও 'অনুপ্রাণিত' বলে চালিয়ে দেওয়া হয়।

৫. ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে এটি রচিত হয়েছিল, বাংলাদেশের সাথে এটির সম্পর্ক একেবারেই ক্ষীণ। 

৬. এটি সংকটে কিংবা দুর্দিনে আমাদের জাগ্রত রাখার সক্ষমতা খুব কমই রাখে।

৭. এটির রচয়িতার প্রতি বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের মতাদর্শের মিল নাই।


বিশ্বের অনেক দেশেই জাতীয় সংগীত পরিবর্তন হয়েছিল নানা প্রেক্ষাপটে। লিঙ্গবৈষম্য, ভাবমূর্তি পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে অনেক দেশ তাদের জাতীয় সংগীতে পরিবর্তন এনেছে। 

এবার একনজরে দেখে নেয়া যাক ওইসব দেশগুলো যারা তাদের জাতীয় সংগীতে পরিবর্তন এনেছে। প্রতিবেদন ডয়চে ভেলের। 

অস্ট্রেলিয়া
প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনের ঘোষণার পর ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে অস্ট্রেলিয়ানরা তাদের জাতীয় সংগীতের একটি ভিন্ন সংস্করণ গাইবেন। নতুন এ জাতীয় সংগীতে অস্ট্রেলিয়াকে আর ‘ইয়াং অ্যান্ড ফ্রি’ হিসেবে আর অভিহিত করা হবে না। আদিবাসীদের সুদীর্ঘ ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটানোর অংশ হিসেবেই এ পরিবর্তন।

জার্মানি
দেশটির সমতা বিষয়ক কমিশনার ক্রিস্টিন রোজে-ম্যোরিং জাতীয় সংগীতে আরো বেশি লিঙ্গ সমতা আনার প্রস্তাব করেছেন। সংগীতের যে অংশে ‘ফাটারলান্ড’ অর্থাৎ ‘পিতৃভূমি’ বলা হচ্ছে, সেখানে ‘হাইমাট’ অর্থাৎ ‘জন্মভূমি’ লেখার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। তবে চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলসহ অনেকেই মনে করছেন, জাতীয় সংগীতে পরিবর্তন আনার প্রয়োজন নেই।

অস্ট্রিয়া
২০১২ সালে লিঙ্গ সমতা আনার জন্য অস্ট্রিয়ার জাতীয় সংগীতে ‘ছেলেরা’-এর জায়গায় ‘মেয়েরা এবং ছেলেরা’ লেখা হয়েছে।

কানাডা
উত্তর আমেরিকার এই দেশটিও সম্প্রতি তাদের জাতীয় সংগীতকে আরো লিঙ্গ নিরপেক্ষ করেছে। সংগীতের দ্বিতীয় লাইনে ‘তোমার সব ছেলেরা’-এর জায়গায় লেখা হয়েছে ‘আমরা সবাই’।

নেপাল
২০০৮ সালে নেপালে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয়। তার আগের বছর নেপালে নতুন একটি গানকে জাতীয় সংগীতের স্বীকৃতি দেয়া হয়। ১৯৬২ সালে গ্রহণ করা নেপালের আগের জাতীয় সংগীতে রাজতন্ত্রের প্রশংসা ছিল। তাই এতে পরিবর্তন আনা হয়।

আফগানিস্তান
দেশটিতে বেশ কয়েকবার জাতীয় সংগীতে পরিবর্তন আনা হয়। তালেবান শাসনামলে আফগানিস্তানে কোনো জাতীয় সংগীতই ছিল না। পরে ২০০২ সালে পুরোনো জাতীয় সংগীতকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। পরে ২০০৬ সালে তৎকালীন কারজাই সরকার সবকিছু নতুন করে শুরু করতে জাতীয় সংগীতও পরিবর্তন করে।

রুয়ান্ডা
আফ্রিকার এই দেশটির কথা উঠলেই গণহত্যার কথা মনে পড়ে। ১৯৯৪ সালে মাত্র ১০০ দিনের মধ্যে ওই দেশে পাঁচ থেকে ১০ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। গণহত্যা পরবর্তী রুয়ান্ডার ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে দেশটি ২০০১ সালে একটি নতুন জাতীয় সংগীত বেছে নেয়।

দক্ষিণ আফ্রিকা
দেশটি ১৯৯৭ সালে আগের দু’টি জাতীয় সংগীত থেকে কিছু অংশ নিয়ে নতুন একটি জাতীয় সংগীত তৈরি করে। আফ্রিকান ও ইংরেজি ভাষায় গানটি রচিত। তবে আফ্রিকান ভাষার অংশটি বর্ণবাদ আমলে ব্যবহৃত জাতীয় সংগীতের অংশ হওয়ায় এর সমালোচনা করেন অনেকে। নেলসন ম্যান্ডেলা সেটি রিকনসিলিয়েটরি ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণবাদ-পরবর্তী দক্ষিণ আফ্রিকার সংগীত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।

রাশিয়া
ভ্লাদিমির পুটিন ২০০০ সালে রুশ প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর ১৯৯০ সালের আগে ব্যবহৃত জাতীয় সংগীত ফিরিয়ে আনেন। তবে গানের কথায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়। ১৯৯০ সালে যে জাতীয় সংগীত গ্রহণ করা হয়েছিল তাতে কোনো কথা না থাকায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া অ্যাথলিটরা এর সমালোচনা করেছিলেন। তাদের বক্তব্য ছিল, কথাবিহীন গান তাদের নাকি উদ্বুদ্ধ করতে পারেনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা না করার জন্য ইংরেজদের নিকট ১৭ বার স্মারকলিপি দিয়েছিলো, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।”       (ড. সলিমুল্লাহ খান)

আপনিও কি জানতেন এই ইতিহাস? আমি সত্যিই জানতাম না। তিনি কি আসলেই এতবেশি বাংলাদেশ বিদ্বেষী ছিলেন? তিনি না আমাদের সোনার বাংলার জন্য জাতীয় সঙ্গীত উপহার দিয়েছিলেন? অঙ্ক মিলেনা…!


মাওঃ ইনায়েতুল কারীম ।

শিক্ষক, লেখক ও ইসলামী গবেষক।

ক্যামব্রিয়ান কলেজ। মোহাম্মদপুর, ঢাকা।



Comments

Popular posts from this blog

ইসলামিক গল্প (1) হিফজের স্বপ্ন। মাওঃ ইনায়েতুল কারীম ।

                                       “হিফজের স্বপ্ন” রিমা নবম শ্রেণির ছাত্রী। বয়স মাত্র চৌদ্দ, কিন্তু আকাঙ্ক্ষা অনেক বড়। প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে সে পাশের মাদরাসায় যায় কুরআন তিলাওয়াত শেখার জন্য। তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন—একদিন পুরো কুরআন হিফজ করা। একদিন বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন এসেছিল। তারা আড্ডায় বসে বলল, — “মেয়েদের এত পড়ালেখা কিসের? বিয়ে দেবে হলেই হলো!” রিমার মা মৃদু হাসলেন, বললেন, — “রাসূল ﷺ বলেছেন, ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রতিটি মুসলিম নর-নারীর উপর ফরজ’। মেয়ে মানুষ জ্ঞান থেকে পিছিয়ে থাকতে পারে না।” সবাই চুপ হয়ে গেল। রিমার চোখে আত্মবিশ্বাস জ্বলজ্বল করছিল। রাতের নামাজ শেষে সে দীর্ঘ দোয়া করল, — “হে আল্লাহ! আমাকে কুরআনের হাফিজা বানিয়ে দিন। আমি আপনার কালাম দিয়ে মানুষের জীবন বদলাতে চাই।” দিনগুলো কেটে যায়। রিমা ধৈর্য, আমল ও চেষ্টা—এই তিন অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে চলে। স্কুলের পড়া, ঘরের কাজ, আর মাদরাসার হিফজ—সব সামলে চলে সে। মাঝে মাঝে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন মনে পড়ে যায়...

ইসলামিক গল্প (২) একটি খেজুর গাছ। মাওঃ ইনায়েতুল কারীম।

একটি খেজুর গাছ :  একদিন এক ছোট গ্রামে একজন দরিদ্র কৃষক বাস করত। তার নাম ছিল আবদুল্লাহ। আল্লাহর প্রতি তার ভরসা ছিল অটুট, কিন্তু জীবনে দারিদ্র্য তাকে সবসময় কষ্ট দিত। একদিন সে তার ছোট ছেলেকে নিয়ে বাগানে কাজ করতে গেল। সেখানে একটি শুকনো খেজুর গাছ দাঁড়িয়ে ছিল—বছরের পর বছর ফল দিচ্ছিল না। ছেলেটি বলল, “আব্বা, এই গাছটা কেটে ফেলি না কেন? এর কোনো উপকার নেই।” আবদুল্লাহ মৃদু হেসে বললেন, “না বেটা, হয়তো আল্লাহ একদিন এই গাছকে আবার জীবিত করে তুলবেন। আল্লাহর রহমত থেকে কখনো হতাশ হও না।” কয়েকদিন পর প্রচণ্ড বৃষ্টি হলো। বৃষ্টির পর সবাই দেখল, সেই শুকনো খেজুর গাছে নতুন পাতা গজিয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই তাতে মিষ্টি খেজুর ধরল। গ্রামের লোকজন অবাক হয়ে বলল, “আবদুল্লাহ ভাই, আপনি গাছটা কেটে ফেলেননি বলে আল্লাহ আপনাকে বরকত দিয়েছেন।” আবদুল্লাহ বললেন, “আল্লাহর রহমতে কিছুই অসম্ভব নয়। ধৈর্য আর আশা—এই দুই-ই মুমিনের সম্পদ।

ইসলামিক গল্প (৩) "হিফজখানার মেয়ে"। মাওঃ ইনায়েতুল কারীম।

 “হিফজখানার মেয়ে” নূরজাহান বারো বছরের এক মেয়ে। গ্রামের ছোট এক হিফজখানায় থাকে। বাবা-ছাড়া সংসার—মা দিনমজুর। নূরজাহানের স্বপ্ন সে একজন হাফেজা হবে, যাতে কিয়ামতের দিন সে মায়ের মাথায় নূরের মুকুট পরাতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো— সে খুব দুর্বল শরীরের মেয়ে। প্রায়ই অসুস্থ হয়। অনেক সময় লম্বা রোজা, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কোরআন তিলাওয়াত— এসবেই মাথা ঝিম ধরে। সহপাঠীরাও মাঝে মাঝে বলে—  “তুই পারবি না। কষ্টের জীবন কারো কাজে আসে না।” একদিন হঠাৎ নূরজাহান জ্বরে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। চিকিৎসক বলেন, “এত চাপ নেবে না, পড়া বন্ধ রাখো।” খবর শুনে মা চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল, — “মা, যদি তোর জীবনই না থাকে, তাহলে হিফজ করে কী হবে?” চোখ খুলতেই নূরজাহান দুর্বল কণ্ঠে বলল, — “মা, জীবন আমার—আর উদ্দেশ্যও আমার। আল্লাহ্‌ চাইলে মৃত্যু ঘরে বসেও আসবে। কুরআন মুখস্থ করে মরলে মরাই শ্রেষ্ঠ।” পরদিন থেকেই সে আবার শুরু করে। সে কাঁপা কাঁপা গলায় শুধু একটি দোয়া পড়তে থাকে— “اللهم أعني على حفظ كتابك” — হে আল্লাহ! আপনার কিতাব হিফজে আমাকে সাহায্য করুন। দিন যায় মাস যায়। অবশেষে কোরআনের শেষ রুকু’টিও পড়া শেষ হয়...